মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া: ভাঙাচোরা বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে পঞ্চায়েত সদস্য টেম্পু ওরাওঁ হাঁক দিলেন, ‘আইও ঘারে আহে? রিপোর্টার আহে।’ (মা, বাড়ি আছ? সাংবাদিক এসেছেন)। ঘর থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা। শনের মতো সাদা চুল এলোমেলো। বৃদ্ধার শরীরটা কাঁপছিল। তিনি জয়বীরপাড়া চা বাগানের ছোট লাইনের বছর সত্তরের মারথা মুন্ডা। একজন অবসরপ্রাপ্ত চা শ্রমিক তথা ডাগরিন। মারথার একমাত্র সন্তান মারা গিয়েছেন। তবে গোটা বাগানটাজুড়ে ছড়িয়ে মারথার ছেলেমেয়েরা। সংখ্যাটা কত, তিনি নিজেও জানেন না। কারণ মারথা বছরের পর বছর বাগানের অন্য শ্রমিক মায়েদের সন্তানদের দিনভর দেখভাল করেছেন। এরপর ৫৮ বছর বয়সে অবসর নিয়েছেন। তবে ঘর থেকে বেরোলে আজও পথেঘাটে বা বাজার-দোকানে মা ডাকটাই শোনেন তিনি। টেম্পু বলছিলেন, ‘ডাগরিনরা তো মায়ের স্নেহে বড় করেছেন আমাদের।’
শহরে আর চা বলয়ে ‘ক্রেশ’ শব্দটার অর্থ কিন্তু আলাদা (Creche)। এখানে ক্রেশ শব্দটায় জড়িয়ে চা বাগানের প্রজন্মের পর প্রজন্মের আশৈশব স্মৃতি, আবেগ। শ্রমিক মায়েরা একটা গামছায় জড়িয়ে শিশুদের পিঠে বেঁধে সাতসকালে বেরিয়ে যান কাজে। চা বাগানের রাস্তায়, গাছতলায় পলিথিন শিট পেতে শুইয়ে রাখা হয় শিশুদের। ছাদ বলতে মাথার ওপর টাঙিয়ে রাখা আরেকটা পলিথিন শিট। সারাদিন ওদের দেখভাল করার দায়িত্বে থাকেন দু’-তিনজন মহিলা চা শ্রমিক। ওঁদের বলা হয় ডাগরিন। ওঁরা খুদেদের যত্নআত্তি করেন, গান গেয়ে শোনান। এভাবেই বেড়ে ওঠে চা বাগানের শিশুরা।
তৃণমূল সরকার চা বাগানে ক্রেশ তৈরিতে পদক্ষেপ করেছে। জয়বীরপাড়া চা বাগানে ক্রেশের ঝাঁ চকচকে ভবনটা মার্বেল টাইলসে মোড়া। সামনে ফুল গাছ। ওখানে সারাদিন খেলা করে শিশুরা। মধ্যাহ্নভোজনও ক্রেশেই। তাই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে জয়বীরপাড়ার ডাগরিনদের। মারথা মুন্ডা ছাড়াও ডাগরিন ছিলেন জয়বীরপাড়ার বড় লাইনের সুশীলা তাঁতি, সুখনি ওরাওঁরা। মারথা, সুখনিরা অবসরপ্রাপ্ত। বছরখানেক আগে ক্রেশ উদ্বোধনের পর সুশীলাকে ফের চা পাতা তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ ক্রেশ পরিচালনার দায়িত্বে এখন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। এখন অদিতি শা, রিদম খাড়িয়াদের মতো খুদেদের যত্নআত্তি করার দায়িত্বে মমতা কুজুররা। ভবনটায় পড়ুয়াদের বেড়ে ওঠাটাও যেন অনেকটাই ‘স্মার্ট’। জয়বীরপাড়ার ক্রেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যা জ্যোৎস্না লোহারের মন্তব্য, ‘আমরাও ডাগরিনদের মতোই শিশুদের যত্নআত্তি করি। স্নান করাই। খাওয়াই। নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করি ওদের।’
সাতসকালে জয়বীরপাড়ার মতো আরও অনেক বাগানের শিশুরাই এখন মায়ের পিঠে বাঁধা গামছায় নয়, টোটোয় চেপে পৌঁছে যায় ক্রেশে। আবার পড়ন্ত দুপুরে ‘টোটোকাকু’ ওদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেবে। ততক্ষণে মায়েদের পাতা তোলা শেষ। তা বলে সব জায়গায় তো এখনও ক্রেশ হয়নি। যেমন নাংডালা চা বাগানের ছবিটা আগের মতোই আছে। ওই বাগানের ভাদোয়া লাইনের নমিতা টোপ্পো ২৫ বছর ধরে ডাগরিন। বাগানে পাতা তুলছিলেন রিংকি হেমব্রমরা। কাছেই একটা পলিথিন শিট টাঙানো। নীচে মাটিতে বিছানো আরেকটা পলিথিন শিট। ওতে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল রিংকির এক বছরের ছেলে। আশপাশে আরও দশ-বারোটি শিশু। পরম মমতায় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন নমিতা। কারও মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, ‘জন্ম দিইনি তো কী হয়েছে? এরা আমার ছেলেমেয়ের মতোই।’
নাংডালার আরেক ডাগরিন বঙ্কি ইন্দোয়ার বললেন, ‘হয়তো এখানেও কখনও ক্রেশ তৈরি করা হবে। বাচ্চাদের সুবিধা হবে। এরপর আমাদের ফের পাতা তুলতে হবে।’ তাতে বঙ্কি বা নমিতাদের পারিশ্রমিক কমবে না। কিন্তু এই কাজটা হারালে মনটা খারাপ হয়ে যাবে। তাও বঙ্কি বলছিলেন, ‘১৫-১৬ বছরে কয়েকশো ছেলেমেয়ের মা হয়েছি। তবু চাইছি, এখানে ক্রেশ তৈরি করা হোক। তাতে ওদের ভালো হবে।’
সরকারের তৈরি ক্রেশ রয়েছে বীরপাড়া চা বাগানে। দলমোড় চা বাগানে ক্রেশ নির্মীয়মাণ। নিয়ম মোতাবেক প্রত্যেকটি চা বাগান কর্তৃপক্ষের ক্রেশ তৈরি করার কথা। কিন্তু ৯০ শতাংশ চা বাগানেই তা নেই। তাই সরকার তৈরি করছে। তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি উত্তম সাহার কথায়, ‘মালিকপক্ষ তৈরি করলে ডাগরিনরাই শিশুদের দেখভাল করতেন। তবে সরকারকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মানতেই হয়।’
