উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ কোচবিহারে ‘পার্সেল’ রহস্যের (Coochbehar Doc Return) নাটকীয় মোড়। পার্সেল প্রাপক ভেবেছিলেন বিবেকের দংশনে চোর ফিরিয়ে দিয়েছে চুরি যাওয়া নানান প্রয়োজনীয় নথিপত্র। বিষয়টি জানাজানি হতেই চোরের কীর্তিতে কুর্নিশ জানিয়েছিল শহরবাসীও। কিন্তু সেটা যে সত্য নয় তা সামনে এল নথি পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পরেই। কিন্তু যাকে ‘বিবেকের দংশন হওয়া চোর’ ভেবে কুর্নিশ জানাচ্ছিল শহরবাসী, তিনি আসলে অন্য কেউ নন— খোদ অর্ধেন্দু বণিকের প্রাক্তন স্ত্রী। মঙ্গলবার এই সত্য প্রকাশ্যে আসতেই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তবে এই নথি ফেরত পাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ।
গত ২৭ ডিসেম্বর বাড়ির ঠিকানায় একটি পার্সেল পেয়েছিলেন পরিবেশকর্মী অর্ধেন্দু বণিক। পার্সেল খুলে তিনি দেখেন, ৭ বছর আগে বাড়ি থেকে চুরি যাওয়া দুটো ফাইল। তার মধ্যে তাঁর স্কুল-কলেজের যাবতীয় শংসাপত্র, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড ইত্যাদি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিল। সাত বছর ধরে তিনি হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। কিন্তু তিনি সেসব পাননি। গত শনিবার হঠাৎ বাড়ির দরজায় সে সব পৌঁছে দেন ডাক বিভাগের এক কর্মী। পার্সেল খুলতেই চক্ষুচড়কগাছ হয়ে যায় অর্ধেন্দুবাবুর। ফিরে পান হারয়ে যাওয়া যাবতীয় নথি। সোমবার থানায় গিয়ে জানিয়ে এসেছেন, চুরি যাওয়া জিনিস ডাকযোগে ফেরত পেয়েছেন। তিনি জানান, এসআইআর আবহে সমস্যায় পড়তে পারেন, এই ভেবেই হয়তো ‘মানবিক চোর’ সব ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু চোর কে তা জানার কৌতূহল ছিল তাঁর। ঘটনার দুদিনের মাথায় তিনি জানতে পারেন, এই নথি ফিরয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী।
এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন স্ত্রী সংবাদমাধ্যমের কাছে জানান, ২০১৮ সালে পারিবারিক বিবাদের জেরে শ্বশুরবাড়ি ছাড়ার সময় রাগের মাথায় অর্ধেন্দুবাবুর নথিপত্র নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন বলে দাবি করেছেন তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী।মঙ্গলবার তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে জানান, “২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যখন বাড়ি ছাড়ি, জিনিসপত্র গোছগাছের সময় ভুল করে ফাইলগুলো ব্যাগে ঢুকে গিয়েছিল। ডিভোর্সের মামলা চলায় সেই সময় বিষয়টি আর সামনে আনিনি। কিন্তু সম্প্রতি মনে হলো যার জিনিস তাকে ফেরত দেওয়া উচিত। এসআইআর বা অন্য কিছু ভেবে নয়, স্রেফ মানবিক খাতিরেই ৪৫০ টাকা খরচ করে পার্সেল পাঠিয়েছি। অথচ এখন আমায় ‘চোর’ অপবাদ শুনতে হচ্ছে!” পরিচয় গোপন রাখতে তিনি জনৈক এক বন্ধুর নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন।
যদিও প্রাক্তন স্ত্রীর দাবি মানতে নারাজ অর্ধেন্দু বণিক। তাঁর দাবি, “তালাবন্ধ আলমারি থেকে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল কী করে ভুল করে ব্যাগে ঢোকে? আমি ডিভোর্সের সময় ও তার পরেও বারংবার জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও ও নথির কথা অস্বীকার করেছিল। এমনকি আদালতেও মিথ্যা বলেছিল যে আমার কোনো নথি ওর কাছে নেই।” অর্ধেন্দুবাবুর মতে, মালিককে না জানিয়ে এবং অনুমতি ছাড়া প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে যাওয়াটা ‘চুরি’রই সমান। এই ৭ বছর নথিপত্র না থাকায় তাঁকে যে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে, তার জন্য তিনি এখন প্রাক্তন স্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রথমে যাকে ‘সহৃদয় চোর’ ভেবে এলাকায় হইচই পড়েছিল, এখন জানা যাচ্ছে সেটি ছিল দীর্ঘদিনের এক তিক্ত দাম্পত্য কলহের জের। শংসাপত্র ও প্যান কার্ডের মতো অতিপ্রয়োজনীয় নথিপত্র ফিরে পেয়ে অর্ধেন্দুবাবু স্বস্তিতে থাকলেও, প্রাক্তন স্ত্রীর এই আচরণকে তিনি চরম অপরাধ হিসেবেই দেখছেন। অন্যদিকে, ‘চোর’ অপবাদ পাওয়ার পর প্রাক্তন স্ত্রী রীতিমতো মর্মাহত। সব মিলিয়ে, কোচবিহারের এই নথি-রহস্য এখন কোনও থ্রিলার সিনেমার গল্পকেও হার মানাচ্ছে।
