কোচবিহার: শতাব্দী প্রাচীন উত্তরের ঐতিহ্যবাহী কোচবিহার রাসমেলা। সেখানে কয়েক দশক আগেও দূষণের এত বাড়াবাড়ি ছিল না। সেই সময়ও ব্যবসা হত, মেলা বসত, কিন্তু সেটায় পরিবেশে কোনও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলত না। এখন মেলাজুড়ে শুধুই দূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ আরও কত কি। অথচ বিধি মনে করিয়ে দেওয়া কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ছে না চত্বরে। ঐতিহ্যবাহী রাসমেলার পরিবেশ রক্ষার খামতি নিয়ে আলোকপাত করলেন তুফানগঞ্জ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশকর্মী তাপস বর্মন।
অনাদরে কাঁসার থালাতেও দাগ লাগে! তাই ঐতিহ্যকে শুধু বহন করলেই হয় না, কালের নিয়মে তাতে ময়লা লাগলে সেটাকে যত্নের সঙ্গে পরিচর্যা করে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে হয়।
কোচবিহারের রাসমেলা এক ঐতিহ্যের নাম। একসময় গোরুর গাড়িতে চেপে তীর্থযাত্রীরা এই মেলা দেখতে আসতেন। সেই পুরোনো দিনগুলি থেকেই লোহা, মাটি, কাঠের সামগ্রীর পসার সাজিয়ে বসতেন দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা। তখন প্লাস্টিক পণ্যের অস্তিত্ব তেমন ছিল না। এমনই এক দূষণহীন মেলার গল্প শুনলাম ঝিনাইডাঙ্গার এক প্রবীণার কাছে, বাবার সঙ্গে গোরুর গাড়িতে মেলায় আসতেন তিনি। বাবার নির্দেশ ছিল, দোকানের কোনও জিনিসপত্রে হাত দেওয়া যাবে না, তাহলে পুলিশ ধরবে।
সময়ের নিয়মে মেলায় কিছু কিছু জিনিসের বদল হয়েছে। প্রায় শেষের দিকে কোচবিহার জেলা সংশোধনাগার থেকে সোজা মদনমোহন মন্দির পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে, রাসমেলার মাঠে, স্টেডিয়ামের মাঠ, কোচবিহার ক্লাবের সামনের জায়গাজুড়ে হরেকরকম দোকান, ছোট স্টল বসেছে। এর মধ্যে রয়েছে রকমভেদও। খাওয়ার দোকান, শীতবস্ত্রের দোকান, বিভিন্ন আসবাবপত্রের দোকান এবং কাঁচা শাকসবজি সহ মাছ, মাংসের দোকানগুলো নিজ নিজ চত্বরে বসেছে। যেন এক একটা ক্লাস্টার। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি জিনিস ভীষণ কমন। তা হল, প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা আইনের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।
কেন্দ্র, রাজ্য উভয়ের আইন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে সর্বত্র ১২০ মাইক্রোনের কম প্লাস্টিক পণ্যের থালা, প্লেট, কাপ, চামচ, কাঠি সহ ক্যারিব্যাগ উৎপাদন, বিক্রি ব্যবহার বন্ধ। কিন্তু সেই সব নিয়ম বাস্তবে পালন হচ্ছে কি! মেলা চত্বরের ফুচকার দোকান থেকে মেলার কেন্দ্রে থাকা নামীদামি রেস্টুরেন্টেও দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে সবধরনের নিষিদ্ধ প্লেট, থার্মোকলের থালা, বাটি। এমন কোনও দোকান দেখা গেল না, যারা নিষিদ্ধ প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছে না। এর কি বিকল্প সম্ভব? দুটি ক্ষেত্রে দেখা গেল, হাতেগোনা দু’তিনটি দোকান প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে একধরনের ক্যারিব্যাগ দিচ্ছে। কোচবিহার ক্লাবের সামনের এক বাদাম বিক্রেতা ক্ষতিকরহীন কাগজের ঠোঙা ব্যবহার করছেন। অথচ ছোট-বড় চপের দোকানেও খবরের কাগজ দিয়ে তৈরি ঠোঙায় খাবারগুলি দিচ্ছে। যে যাই কিনছে, খেলনা থেকে সংসারের সামগ্রী, এমনকি পোশাক, তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা রকমের প্লাস্টিক ক্যারিবাগ। ফাস্ট ফুডের প্রতিটি দোকানের সামনে রাখা ছোট-বড় বিন ভরে যাচ্ছে সেই নিষিদ্ধ প্লাস্টিক পণ্যে। এই দৃশ্য কি স্বস্তি দেয়!
এমনিতেই কোচবিহারে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের পরিকাঠামো নেই। তাহলে কি বিগত কয়েক বছরের মতো মেলা শেষে প্লাস্টিকের পণ্য, বর্জ্য মাঠে জমিয়ে রেখে পরে পুড়িয়ে দেওয়া হবে? না কি, তোর্ষার জলে ভাসিয়ে নদীকে করা হবে দূষিত? মেলার ঐতিহ্য আগেও ছিল, থাকবে আগামীতেও, কিন্তু প্লাস্টিক দূষণ ছিল না। এটা ঐতিহ্যের বিষয় নয়। প্লাস্টিক দূষণের সঙ্গে জুড়েছে শব্দ দূষণও। তাতে নাজেহাল স্থানীয় থেকে মাঠের দর্শকরাও। বিশেষ করে মেলার মাঠের দক্ষিণপ্রান্তে থাকা নাগরদোলা, চিত্রাহারের টেন্ট থেকে বিকট শব্দ ভেসে আসছে। কিছু ছোট দোকানের সামনেও দেখা গেল, মাইকে কিছু একটা বেজে চলেছে। দোকানিরা সেই শব্দে বিরক্ত। এক পিঠে বিক্রেতা তাঁর কর্মীকে বলছেন, পাশের দোকানের মাইকটা আমাদের স্টলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে কি না, দেখত! সমস্যাটা পরিষ্কার।
২০০৭ সাল থেকে যে কোনও মেলা এবং উৎসবকে পরিবেশবান্ধব করার দায়িত্ব সরাসরি পুরসভা, পুলিশ এবং প্রশাসনের কাঁধেই ন্যস্ত। মেলার একপ্রান্তে শান্ত ঘোরাটোপে পুরসভার চেয়ারম্যান, জেলা শাসক, পুলিশ সুপার সহ সহকারী পুলিশ সুপারদের অস্থায়ী দপ্তর রয়েছে। অথচ মেলায় দূষণবিধি নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা তো দূরের কথা, পরিবেশবিধি মেনে চলার বার্তা দিতে মেলা চত্বরজুড়ে প্রশাসনের তরফে একটা বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। অথচ কয়েক বছর ধরে একটি পরিবেশ সংগঠন মেলার আগে নিয়ম করে সরকারি নির্দেশিকাগুলো উল্লেখ করে এই বিষয়গুলো দেখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাদের চিঠি দিয়েছে। তাহলে শহরের প্রশাসন কি বধির!
