উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও কীভাবে বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা (Chief of Opposition Case) হিসেবে বেছে নিলেন বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু? এই নজিরবিহীন ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। স্পিকারের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বালিগঞ্জের বিধায়ক তথা তৃণমূল মনোনীত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বুধবার বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের একক বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শেষ হয়েছে। আদালত আপাতত রায়দান স্থগিত রেখেছে এবং বৃহস্পতিবার সকালে এই বিষয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হতে পারে।
আদালতের তীব্র পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন
শুনানি চলাকালীন স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে একাধিক কড়া প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। তাঁর মূল পর্যবেক্ষণগুলি হলো:
- প্রথম চিঠি বনাম দ্বিতীয় চিঠি: তৃণমূলের তরফ থেকে পাঠানো প্রথম চিঠিকে গুরুত্ব না দিয়ে, কেন পরবর্তী সময়ে আসা দ্বিতীয় চিঠিটির ভিত্তিতে তড়িঘড়ি পদক্ষেপ করলেন স্পিকার? প্রথম আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে কোথায় বাধা ছিল?
- প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের অভাব: সই জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর স্পিকারের উচিত ছিল দু’পক্ষকেই ডেকে শুনানি করা। যিনি প্রথম আবেদন করেছিলেন, তাঁকে কোনও শুনানির সুযোগ না দিয়েই কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের (Pure Justice) নীতি এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে।
- বহিষ্কৃত ব্যক্তি কীভাবে নেতা: যদি স্পিকার ১ জুন সংশ্লিষ্ট বিধায়কের বহিষ্কারের চিঠি পেয়ে থাকেন, তবে ৩ জুন সেই বহিষ্কৃত ব্যক্তিকেই তিনি কীভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন?
বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের পর্যবেক্ষণ, “বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল কি না, সেই প্রশ্নে আদালত যাচ্ছে না। কিন্তু দলের কথা না শুনে, দাবির সত্যতা যাচাই না করে, শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্পিকার কি এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?”
কী এই বিধানসভার ক্ষমতার লড়াই?
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ৮০টি আসনে জয় পেয়ে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পায়। দলের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম চূড়ান্ত করেন এবং ৯ মে স্পিকারকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ, স্পিকার সেই চিঠির ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপ করেননি। পরবর্তীতে ওই চিঠিতে বিধায়কদের সই জাল করার অভিযোগ ওঠে।
এরই মধ্যে ১ জুন দলবিরোধী কাজের জন্য ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। কিন্তু নাটকীয় মোড় আসে ৩ জুন, যখন তৃণমূলের একদল বিক্ষুব্ধ বিধায়ক স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বহিষ্কৃত ঋতব্রতকে নিজেদের নেতা ঘোষণা করে চিঠি দেন। স্পিকার রথীন্দ্র বসু সেই চিঠির ভিত্তিতেই ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা ঘোষণা করেন, যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
আদালতে তিন পক্ষের সওয়াল-জবাব
- স্পিকারের পক্ষে (আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্য): তৃণমূলের দেওয়া প্রথম চিঠিতে সই জালের অভিযোগ পাওয়ায় স্পিকার প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করেন। অন্যদিকে, দ্বিতীয় চিঠিটি দেওয়ার সময় ৫৮ জন বিধায়ক সশরীরে স্পিকারের সামনে হাজির হয়ে ঋতব্রতকে সমর্থন জানান এবং নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেন। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের নির্দিষ্ট আইন নেই, তাই স্পিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের মত মেনে নিয়েছেন।
- ঋতব্রতের পক্ষে (আইনজীবী জয়দীপ কর): তৃণমূলের প্রথম প্রস্তাবে কোনও স্বাক্ষর ছিল না। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতাই শেষ কথা। ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন ঋতব্রতের দিকে রয়েছে। তাছাড়া, দলত্যাগবিরোধী আইন অনুযায়ী এই বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে এখনও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি, তাই তাঁরা এখনও দলেরই সদস্য। এই ক্ষেত্রে স্পিকারের সিদ্ধান্তে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।
- শোভনদেবের পক্ষে (আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়): বিরোধী দলনেতা কে হবেন, তা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ঠিক করে, পরিষদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেখানে বিবেচ্য হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়েও রাজনৈতিক দলকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতৃত্ব শোভনদেবকে মনোনীত করেছিলেন, স্পিকারের কাজ ছিল তা কার্যকর করা। কিছু বিধায়ক আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করে দলের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারেন না। সর্বোপরি, দল থেকে বহিষ্কৃত কাউকে বিরোধী দলনেতা করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সব পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি কৃষ্ণ রাও মামলার রায় স্থগিত রাখেন। বৃহস্পতিবার সকালেই জানা যাবে, বিধানসভার এই হাইভোল্টেজ দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কার জয় হয়।

