বর্ধমানঃ গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হচ্ছে ছাব্বিশে বাংলা জয়ের স্বপ্ন দেখানো বঙ্গ বিজেপির অন্দরে। তার প্রভাব যেন প্রগাড় ভাবে পড়েছে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া সাংগঠনিক জেলায়। নবনির্বাচিত জেলা সভাপতি স্মৃতিকণা বসুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে একের পর এক আদি বিজেপি নেতা জেলা কমিটি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিচ্ছেন। বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে জেলা বিজেপির অন্দরে এমন ক্ষোভ বিক্ষোভ তৈরি হওয়ায় বেজায় খুশি তৃণমূল শিবির।
বাংলা দখলের জন্য ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করেছে বঙ্গ বিজেপি। লড়াই জোরদার করতে বিজেপি নেতৃত্বের তরফে দলীয় নানা পদে ঘটানো হয়েছে রদবদল। সেই মতো কয়েক মাস আগে দলের কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি পদ থেকে গোপল চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই পদে স্মৃতিকণা বসুকে বহাল করা হয়েছে। কিন্তু তাতে সংগঠন চাঙ্গা হওয়ার মতো এখনো পর্যন্ত কিছু দেখা যায়নি। বরং স্মৃতিকণা বসু সভাপতি হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ৮ জন বিজেপি নেতা জেলা কমিটি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিয়েছেন। তার মধ্যে ৫ জন হলেন জামালপুর বিধানসভা থেকে জেলা কমিটিতে স্থান পওয়া বিজেপি নেতা। বাকি ৩ নেতা মেমারি, পূর্বস্থলী ও কাটোয়া বিধানসভা এলাকা থেকে জেলা কমিটিতে স্থান পেয়েছিলেন। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে দলের জেলা কমিটিতে এমন ভাঙন দেখে যারপরনাই হতাশ সাধারণ বিজেপি কর্মী ও সমর্থকরা।
জেলা কমিটি থেকে সরে দাঁড়ানো বিজেপি নেতারা বলছেন, “জেলা কমিটির ’পদ’ আসলে হল ’ডানা ছাঁটা’ পদ। নিজের মন মতো লোককে মণ্ডল সভাপতি করতে জেলা বিজেপি সভানেত্রী দলের জেলা কমিটিকে ঢাল করেছেন। মণ্ডল সভাপতি পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পোড় খাওয়া নেতাদের জেলা কমিটিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী করতে চাওয়া নেতাদের ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বানিয়ে দেওয়ার জন্য জেলা কমিটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যের শাসক দলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে বিজেপির জেলা সভাপতি স্মৃতিকণা বসু এই খেলা খেলছেন বলে জেলা কমিটি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেওয়া জামালপুরের বিজেপি নেতা অভিযোগ করেছেন বিজেপি নেতা জগবন্ধু ঘোষ বর্তমানে জৌগ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য।
একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি জানিয়েছেন,“স্মৃতিকণা বসু জেলা সভাপতি হওয়ার দশ দিন পর তাঁকে কোনও কিছু না জানিয়ে মণ্ডল সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেন। তাঁকে জেলা কমিটিতে কেন পাঠিয়ে দেওয়া হল সেই নিয়েও জেলা সভাপতি কিছু জানাননি। মণ্ডল সভাপতি থেকে সরিয়ে জেলা কমিটিতে ঠাঁই দেওয়াটা ডানা ছেঁটে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয় বলে জগবন্ধু ঘোষ দাবি করেছেন।
পাশাপাশি তিনি এও অভিযোগ করেছেন, আদি বিজেপি নেতা কর্মীদের দূরে সরিয়ে রেখে জেলা বিজেপি সভানেত্রী শাসক দল তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের পাশে নিয়েই ঘুরছেন। এইসব করে সভানেত্রী বিজেপির সংগঠনকে কার্যত দুর্বল করে দিয়েছেন। তা দেখে জামালপুর বিধানসভা থেকে আরও চারজন নেতা এবং মেমারি বিধানসভা থেকে আরও এক নেতা আমার মতোই জেলা কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।”
জগবন্ধু ঘোষের মতোই ক্ষুব্ধ কাটোয়ার সুদপুর পঞ্চায়েতের রাধাকৃষ্ণপুরের বাসিন্দা সুজিত হাজরা। সুজিত বাবু মঙ্গলবার বলেন, “আমি আগে মণ্ডল সভাপতি ছিলাম। জেলা কমিটিতে আমি স্থান পাই। কিন্তু বর্তমান জেলা সভানেত্রী জেলা কমিটিতে থাকা নেতাদের বসিয়ে রেখেছেন। তাদের কোনও কার্যক্রমে ডাকাই হচ্ছে না। এই কারণে আমিও জেলা কমিটি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিয়েছি। কাটোয়ার আরও অনেক নেতা আগামী দিনে একই পথে হাঁটবেন বলে সুজিত হাজরা দাবি করেছেন”।
বিজেপির জেলা কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী জামালপুর বিধানসভার বিজেপি নেতা তাপস চট্টোপাধ্যায় তিনি বলেন, “৪৩ বছর হল আমি বিজেপি পার্টির মেম্বার। অখণ্ড বর্ধমান জেলায় বহু আগে থেকে দলটা করছি। দলের অনেক পদে থেকে দায়িত্ব সামলেছি। দলের বর্তমান জেলা সভানেত্রী পার্টি বিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের কাছে টেনে নিয়েছেন। আর গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছে দলের পুরানো নেতাদের। স্মৃতিকণা বসু দলের পুরানো নেতাদের সন্মানও করেন না। তাই জেলা কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।”
তাপস বাবুর সুরেই সুর মিলিয়েছেন, জেলা কমিটি থেকে সরে দাঁড়ানো মেমারি বিধানসভার বিজেপি নেতা চন্দ্রশেখর সাউ। তিনি দাবি করেছেন,“যাঁর নিজের কোনও সংগঠন নেই, যিনি নিজের বুথে এজেন্ট বসাতে পারেন না, তিনিই এখন বিজেপির জেলা সভানেত্রী। তৃণমূল ও সিপিএম থেকে আসা লোকজনকে নিয়ে উনি নোংরা রাজনীতির খেলায় মেতেছেন। তাই জেলা কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে চন্দ্রশেখর সাউ দাবি করেছেন।”
বিজেপির কাটোয়া সাংগঠনিক জেলার মেমারিতে আগামী শুক্রবার সভা করতে আসছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তারই মধ্যে দলের অন্দরের এই কোন্দল বেশ বিড়ম্বনায় ফেলেছে দলীয় নেতৃত্বকে। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া পাবার জন্য স্মৃতিকণা বসুকে ফোন করা হলে তিনি বলেন,“কে কি বলছে জানি না। তবে লিখিত ভাবে বা মৌখিক ভাবে আমাকে কেউ কোনও অভিযোগ জানায় নি”।
তবে বিজেপির অন্দরে দ্বন্দ্ব চরম আকার নিয়েছে জেনে তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন,“আসলে বিজেপি কোনও দল নয়, ওটা হল কতকগুলো অসৎ লোকের সমাবেশ। তাই স্বার্থে ঘা লাগলেই ওই দলে অশান্ত তীব্র হয়। সেটাই হয়েছে”।
