সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, মায়ামি: ডালাসের সেই অদ্ভুত রুক্ষ, কাউবয় মেজাজ আর চওড়া রাস্তার মায়া কাটিয়ে এবার গন্তব্য মায়ামি। টেক্সাসের শুষ্ক, উত্তপ্ত হাওয়া পেছনে ফেলে ফ্লোরিডার এই সৈকত শহরে পা রাখতেই এক স্নিগ্ধ, সামুদ্রিক বাতাস যেন শরীর জুড়িয়ে দিল। আগের রাতের ম্যাচ শেষের পর মাঝরাত বিমানবন্দরেই কাটিয়ে, কাকভোরে ফোর্ট ওয়ার্থ থেকে শার্লট হয়ে যখন ফোর্ট লডারডেলে পৌঁছালাম, তখন প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার ক্লান্তিকর বিমানযাত্রার ধকল শরীরে জেঁকে বসেছে। আমেরিকার এক বিশাল প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এই ছুটে চলা সত্যিই বড় ঝক্কির ব্যাপার। এখানকার মানুষ কেন বিমানের আকাশছোঁয়া ভাড়ার বদলে সাত-আট ঘণ্টার দীর্ঘ সড়কপথ অনায়াসে বেছে নেন, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। হার্ড রক স্টেডিয়াম আক্ষরিক অর্থে মায়ামিতে নয়, বরং ফোর্ট লডারডেল, মায়ামি আর হলিউডের ঠিক মাঝামাঝি এক অদ্ভুত মোহময় জায়গায় অবস্থিত। আগামী এগারো দিন এখানেই আমার ডেরা। কারণ ব্রাজিল-স্কটল্যান্ডের পর পর্তুগাল-কলম্বিয়ার মহারণ এবং আর্জেন্টিনার নকআউট পর্ব এই মাঠেই হবে (Brazil vs Scotland)। তবে সব ক্লান্তি যেন কর্পূরের মতো উবে যায় যখন দেখি মায়ামির রাজপথ ক্রমশ হলুদ-সবুজ জার্সির জলোচ্ছ্বাসে ঢেকে যাচ্ছে। স্কটিশ ‘টার্টান আর্মি’-র কোলাহলের পাশাপাশি ব্রাজিলীয় সমর্থকদের সাম্বা ছন্দে ফ্লোরিডার এই সৈকত শহর এখন যেন রিও ডি জেনেইরোর কোনও এক উৎসবমুখর রাস্তা।
ফুটবল রোমান্টিকদের মনে জল্পনা এখনই শুরু হয়ে গিয়েছে- সবকিছু ঠিকঠাক চললে আটলান্টার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে কি দেখা হবে বিশ্ব ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার? সেই স্বপ্নের মঞ্চে পৌঁছাতে নকআউট পর্বে নেইমার ও লিওনেল মেসিদের আরও তিনটি ধাপ পার হতে হবে। ডালাসে মেসিরা যেখানে দুরন্ত ফুটবল উপহার দিয়েছেন, সেখানে ব্রাজিল এখনও সমর্থকদের পুরোপুরি মন ভরাতে পারেনি। তবে হাইতির বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের জয়ে কিছুটা ছন্দে ফেরা সেলেকাও শিবিরে এখন স্বস্তির বাতাস। কারণ ডান পায়ের কাফ মাসলের চোট সারিয়ে পুরোদমে অনুশীলনে ফিরেছেন দলের প্রাণভোমরা নেইমার। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই মরণবাঁচন ম্যাচে তাঁর ফেরাটা দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে, এই পরম স্বস্তির মাঝেই চরম ধাক্কা হয়ে এসেছে মাঝমাঠের অতন্দ্র প্রহরী ক্যাসেমিরোর নতুন চোট। রাফিনহার হ্যামস্ট্রিং চোটের পর ক্যাসেমোরির ছিটকে যাওয়া কার্লো আন্সেলোত্তির কপালের ভাঁজ কিছুটা হলেও দীর্ঘ করেছে।
স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য শুধু নিয়মরক্ষার নয়। গ্রুপে চার পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থাকলেও, দ্বিতীয় স্থানে শেষ করলে নকআউট খেলতে গোটা দলকে মেক্সিকো উড়ে যেতে হবে, যা ব্রাজিল শিবির একেবারেই চাইছে না। তাদের লক্ষ্য শীর্ষস্থান ধরে রেখে নিউ জার্সিতেই নিজেদের ঘাঁটি গড়া। স্কটল্যান্ডের (৩ পয়েন্ট) সামনে আবার এটি টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াই। মরক্কোর কাছে হারের পর তাদের রক্ষণভাগ এখন বেশ চাপে। আন্সেলোত্তি তাঁর কৌশলে স্কটিশদের এই দুর্বলতাকেই পাখির চোখ করেছেন। অ্যান্ড্রু রবার্টসন ও নাথান প্যাটারসনের মতো স্কটিশ উইং ব্যাকরা যখনই হাই লাইনে আক্রমণে উঠে পেছনে জায়গা ফাঁকা করবেন, ঠিক সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইছেন ইতালীয় কোচ। ভিনিসিয়াস জুনিয়ার ও তরুণ এনড্রিকের গতির ঝড়ে স্কটিশ সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার গ্রান্ট হ্যানলির কড়া প্রহরা ভাঙার নীলকশা ইতিমধ্যেই তৈরি। রাফিনহার জায়গায় আজ সুযোগ পেতে চলা গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি যেমন বলছিলেন, ‘আমরা জানি ম্যাচটা খুব কঠিন। ওরা অন্তত এক পয়েন্ট পেতে নিজেদের সব অস্ত্র নিয়েই ঝাঁপাবে। কিন্তু আমরাও নিজেদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরেছি, দুরন্ত একটা ম্যাচ জিতেই আমরা মাঠ ছাড়ব।’ মায়ামির এই সামুদ্রিক বাতাসে এখন শুধুই এক মহাযুদ্ধের বারুদ গন্ধ। মেক্সিকো যাত্রা রুখে দিয়ে সাম্বা কি পারবে আটলান্টার দিকে নিজেদের গতিপথ ঠিক রাখতে? উত্তরের অপেক্ষায় গোটা ফুটবল বিশ্ব।

