উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ হড়পা বানের ক্ষত শুকানোর আগেই ভুটানে নতুন করে ঘনাচ্ছে বিপদের ঘনঘটা। হিমবাহ হ্রদ ফেটে বিপর্যয়ের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সেখানে তৈরি হয়েছে একটি বিপজ্জনক কৃত্রিম হ্রদ (Bhutan Synthetic Lake)। লাগাতার জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় হ্রদটি ভেঙে ফের বড় ধরনের হড়পা বানের প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের বাংলা ও অসমের নদী অববাহিকায়।
ভুটান প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, লুঙ্গু ও গ্যাংচেন ট্যাগ থেকে নেমে আসা নদী এবং তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া শিনতাফু হিমবাহ গলে একটি বিশাল কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। গতবারের হড়পা বানের জেরে ভেসে আসা পাহাড়প্রমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপে ওই হ্রদের মুখ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর ফলে জল বের হতে না পেরে ক্রমশ জলের স্তর মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে এই কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ ভেঙে বা জল উপচে মছু (Mo Chu) এবং পুনাখা চু নদীতে ফের ভয়াবহ হড়পা বান নামতে পারে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে ইতিমধ্যে তাক্তসেমাখাংয়ে পৌঁছেছেন। শিনতাফু, লুঙ্গু ও গ্যাংচেন ট্যাগ নদীর সঙ্গমস্থলে তৈরি হওয়া ওই কৃত্রিম হ্রদটি তিনি নিজে সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে পারেন। হ্রদের জমে থাকা জল নিরাপদ উপায়ে বের করে দেওয়ার কোনো বিকল্প পথ খোলা যায় কি না, তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিচারবিবেচনা চলছে।
ভুটানের এই নতুন প্রাকৃতিক সংকটের জেরে ভারত-ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলিতে ফের উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ভুটান থেকে অতিরিক্ত জল নেমে এলে পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের সংকোশ (Sankosh) নদীর অববাহিকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। যদিও এর আগে ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং অনেকে ঘরে ফিরতে শুরু করেছিলেন, তবে নতুন এই বিপদের খবরে প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কপালে ফের চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ভুটান প্রশাসনের তরফে নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের কঠোরভাবে সতর্ক থাকার এবং নদীর ধার থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যেই আলিপুরদুয়ারের সঙ্কোশ নদীর পাড় থেকে প্রায় ১২ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক জানিয়েছেন, ভুটানের লেমথাং অঞ্চলের শিনতাফু হ্রদের বিপর্যয়ের ফলে প্রায় ৭৪ লক্ষ ঘনমিটার জল নেমে এসেছে মো (মোফু) নদীতে। এ বার তা মিশছে সঙ্কোশ নদীতে।
কোচবিহারের তুফানগঞ্জ এবং সংলগ্ন এলাকার নদীপাড়ের বাসিন্দাদেরও সতর্ক করা হয়েছে। রামপুর-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে মাইকে সতর্কতামূলক প্রচার চালাচ্ছে সেচ দপ্তর। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আবেদন জানাচ্ছে প্রশাসন। সেচ দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার মধ্যে বন্যার জল সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF) এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে (NDRF) তৈরি রাখা হয়েছে।
ভারত ও ভুটানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি পুনাতসাংছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে গেলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে অসম সরকারও। বন্যার সম্ভাবনায় ধুবুরিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানিয়েছে, পরিস্থিতির উপরে নজর রাখা হচ্ছে।

