রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: ২০১৬ সালে শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্কে (Bengal Safari Park) ১৬টি সম্বর (বড় শিংঘা) (Sambar Deer) আনা হয়েছিল। ১০ বছরের ব্যবধানে পার্কে এই হরিণের সংখ্যা কমে মাত্র ছ’টিতে এসে ঠেকেছে। বাকি হরিণগুলির কী হল? পার্কের একটি সূত্রের খবর, সংলগ্ন বানঞ্চল থেকে এখানে অবাধে চিতাবাঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। হরিণগুলি সেগুলিরই উদরস্থ হয়েছে বলে পার্কের কর্মীদের একাংশের ধারণা। আর্ন্তজাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (আইসিইউএন)’–এর তালিকায় বিপন্নপ্রাণ হিসেবে এই হরিণগুলিকে লাল তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ এগুলিকে নিয়ে বেঙ্গল সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের কোনও মাথাব্যথাই নেই। পার্কটি এতটা এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে যে, সবসময় সমস্ত সম্বরকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয় বলে তাদের দাবি।
পার্কের এক কর্মীর বক্তব্য, ‘প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল, এখানে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ছয়টি সম্বরকেই দেখা যাচ্ছে। বাকিগুলির কোনও খোঁজ মিলছে না।’ মহানন্দা অভয়ারণ্য থেকে চিতাবাঘ এসে সেগুলিকে খেয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। ডিরেক্টর ই বিজয় কুমারের অবশ্য বক্তব্য, ‘এখানে কতগুলি সম্বর রয়েছে তা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। তবে এখানে এত বড় এলাকাজুড়ে সম্বরগুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে যে, তাদের খোঁজ করা যায় না।’ বাইরে থেকে চিতাবাঘের এই পার্কে ঢোকার সম্ভাবনা কম বলে তাঁর দাবি।
২০১৬ সালে শিলিগুড়ির অদূরে সৌরিয়া পার্কে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রকল্প ‘বেঙ্গল সাফারি পার্ক’ তৈরি হয়। যার অন্য নাম ‘নর্থ বেঙ্গল ওয়াইল্ড অ্যানিমাল পার্ক’। এই পার্কে তৃণভোজী প্রাণীর জন্যে ৯১ হেক্টর জমি বরাদ্দ রয়েছে। পাশে মাংসাশী প্রাণীর জন্য পৃথক জায়গা বরাদ্দ রয়েছে। যাতে মাংসাশী প্রাণীগুলি তৃণভোজীদের এলাকায় ঢুকতে না পারে সেজন্য ওই এলাকা এনক্লোজার দেওয়া রয়েছে। পার্কের বাইরে চারিদিকে বৈদ্যুতিক ফেন্সিং রয়েছে। বাইরের প্রাণীর ভেতরে আসা ঠেকাতে এই উদ্যোগ। এই তৃণভোজী প্রাণীর জায়গাতেই সম্বরগুলির ঠাঁই হয়েছিল। আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত হওয়ায় এই হরিণগুলির বিশেষ যত্ন নেওয়া হত। নিয়মিত গোনাও হত। তবে হঠাৎ করে কী কারণে তাদের সংখ্যা কমে গেল সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পাশেই মহানন্দা অভয়ারণ্য রয়েছে। সেখান থেকে যে কোনও সময় বন্যপ্রাণী এখানে চলে আসার আশঙ্কা রয়েছে। পার্কের চারপাশে বৈদ্যুতিক ফেন্সিং রয়েছে ঠিকই তবে বর্তমানে বেশ কিছুটা অংশে এই বেড়াজালের কোনও অস্তিত্ব নেই। তাই বাইরে থেকে যেমন বন্যপ্রাণীর এখানে আশার আশঙ্কা রয়েছে তেমনভাবেই পার্কের বন্যপ্রাণও বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বছর
আটেক আগে ভেতরের একটি লেপার্ড বছরের শুরুর দিন বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। জু সুপারভাইজারের এই বিষয়গুলির ওপর সবসময় নজর রাখার কথা। দুটি শিফটে জু সুপারভাইজারদের কাজ থাকে। সকালের শিফটে যিনি কাজ করবেন তিনি দায়িত্ব ছাড়ার আগে রাতের শিফটে থাকা জু সুপারভাইজারকে সবটা জানাবেন। তখনই জানানো হবে যে বাইরের ফেন্সিংয়ে কতটা বিদ্যুৎ প্রবাহ রয়েছে এবং কখন থেকে চালু রয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টিও ঠিকমতো মানা হয় না বলে অভিযোগ। আর একারণেই প্রায়ই বাইরে থেকে চিতাবাঘ ভিতরে আসছে বলে পার্কের কর্মীদের একাংশের দাবি।
মাসদুয়েক আগেই বেঙ্গল সাফারির ঠিক পেছনের গ্রাম তরিবাড়িতে চিতাবাঘের আনাগোনা হঠাৎ করে বেড়ে গিয়েছিল। স্থানীয়রা দাবি করেছিলেন, ফেন্সিংয়ের ওপারে বেঙ্গল সাফারি পার্কের ভেতর থেকে চিতাবাঘ বাইরে বেরিয়ে আসছিল। পার্কের কর্মীদের বক্তব্য এবং তরিবাড়ির বাসিন্দাদের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, চিতাবাঘের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে পার্কের ভিতর ও বাইরে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। গোটা ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি উঠেছে। আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত প্রাণীকে নিয়ে পার্ক কর্তৃপক্ষ কেন এতটা গা-ছাড়া মনোভাব দেখাচ্ছে সে বিষয়েরও তদন্তের দাবি উঠেছে।
