বর্ধমান: টানা তিনদিন ধরে জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন তিনি। এরপরেই রবিবার পূর্ব বর্ধমান (Bardhaman) জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবার সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে বৈঠকে বসলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী (Well being Minister) শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। জেলা পরিষদের ‘অঙ্গীকার হল’-এ তাঁর নেতৃত্বেই অনুষ্ঠিত হল এদিনের এই ম্যারাথন বৈঠক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র, জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক-সহ স্বাস্থ্য দপ্তরের বিভিন্ন আধিকারিকরা। তবে এদিনের বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার এবং জনস্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ রায়।
জানা গিয়েছে, ৩ দিনের টানা পরিদর্শনের দরুন জেলার হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো, চিকিৎসা পরিষেবা, কর্মী-ঘাটতি, পরিচ্ছন্নতা,অগ্নিনিরাপত্তা,অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা-সহ একাধিক সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।এদিনের বৈঠকে সেই সমস্যাগুলির দ্রুত সমাধানে কী পদক্ষেপ করা যায়, তার রূপরেখা তৈরি করা হয়।
এই প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, হাসপাতালের ভিতরের অংশ অনেক জায়গায় পরিষ্কার থাকলেও বাইরের পরিসর অপরিচ্ছন্ন থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাই মহকুমা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলিতে প্রায় ৩০ ফুট অন্তর সাধারণ বর্জ্য ফেলার বিন বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার রাখার জন্য সাধারণ মানুষের কাছেও আবেদন জানান তিনি। লজেন্স, গুটখা, বিড়ি-সিগারেট বা অন্যান্য সামগ্রীর র্যাপার যেখানে-সেখানে না ফেলে নিজের পকেটে রাখার আবেদন জানান মন্ত্রী।
পরিদর্শনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে কর্মী-ঘাটতি। চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ, টেকনিশিয়ান, সাফাইকর্মী এবং নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। এই ঘাটতি পূরণে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে নিয়োগে কোনও ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম যাতে না হয়, সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়, অতীতের নিয়োগ দুর্নীতির ‘ভূত’ এখনও মানুষের মনে রয়েছে। তাই নতুন করে কোনও নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ উঠুক, তা তাঁরা চান না। স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে কিছুটা সময় লাগবে বলে জানান তিনি।
তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসক-ঘাটতি মেটাতে ‘লোকাল ফর লোকাল’ পদ্ধতির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কর্মরত বা এলাকার বাসিন্দা এমন চিকিৎসক ও কনসালট্যান্টদের সপ্তাহে কয়েকদিন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পরিষেবা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। কাটোয়া হাসপাতালের তিনজন চিকিৎসকের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করার কথাও জানান তিনি। স্থানীয় চিকিৎসকদের যথাযথ পারিশ্রমিক ও সম্মান দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
নার্সিং স্টাফের ঘাটতি মেটাতে নতুন বেসরকারি নার্সিং কলেজগুলিকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সরকারের সহযোগিতায় নার্সিং কর্মীর ঘাটতি পূরণে উদ্যোগী হওয়ার জন্য তাঁদের কাছে আবেদন জানান তিনি।
চিকিৎসা পরিকাঠামোর (Well being care) ঘাটতি মেটাতে ইতিমধ্যেই মোবাইল মেডিকেল ইউনিট চালু করা হয়েছে। চারটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল মেডিকেল ইউনিট পরিষেবা দেওয়া শুরু করেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এই ইউনিটগুলিতে এক্স-রে, ইউএসজি, সেমি-অটো অ্যানালাইজার, ইসিজি, চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফের ব্যবস্থা রয়েছে। আগামী দিনে ডিজিটাল বা হ্যাণ্ডহেল্ড এক্স-রে, ইউএসজি-সহ আরও প্রয়োজনীয় যন্ত্র সরবরাহ করা হবে।
জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলিতে সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। একটি মেডিকেল কলেজে একটি মাত্র সিটি স্ক্যান মেশিন দিয়ে পর্যাপ্ত পরিষেবা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি উদ্যোগে অথবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে নতুন মেশিন বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রোগীদের খাবার পরিবেশন নিয়েও একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উন্নতমানের স্টিলের বাসনপত্র ব্যবহারের পাশাপাশি কম্পার্টমেন্টাল পদ্ধতিতে খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। একই বিছানায় একাধিক রোগী থাকার সমস্যারও সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সদ্য অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান হওয়া রোগী-সহ বিশেষ শারীরিক সমস্যায় থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির লোক রাখার বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপের কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।
পরিদর্শনে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফদের আবাসন সমস্যাও সামনে এসেছে। কোথাও জল জমে থাকা, কোথাও সাপের আতঙ্ক, আবার কোথাও অত্যন্ত খারাপ আবাসন পরিকাঠামোর অভিযোগ রয়েছে। চারজন মেডিকেল অফিসারকে একটি ঘর ও একটি বাথরুম ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে এমন ঘটনাও দেখেছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কর্মীরা যাতে নিরাপদ ও ভালো পরিবেশে থাকতে পারেন, সেই জন্য আবাসন ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
এর পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবায় স্বচ্ছতা আনতেও নতুন নীতি তৈরি করা হচ্ছে। তিন ধরনের অ্যাম্বুলেন্স- সাধারণ ট্রান্সপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন ও বেসিক সাপোর্টযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স এবং আইসিইউ সুবিধাযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স-এর জন্য পৃথক ভাড়ার কাঠামো তৈরি হবে। কিলোমিটার অনুযায়ী ভাড়া এবং কলকাতা যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রেট নির্ধারণের দায়িত্ব জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে দেওয়া হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবায় রোগীর পরিবার ও চালকের মধ্যে আর্থিক লেনদেনে তৃতীয় কোনও ব্যক্তির হস্তক্ষেপ যাতে না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে ফায়ার অডিট করে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। সব প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত না থাকায় রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য আরও সময় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত মক ড্রিল করে অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে কর্মীদের প্রস্তুত রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পূর্বস্থলী ১ নম্বর কাটোয়া, অনাময় ও মেমারি-সহ একাধিক হাসপাতালে এয়ার কন্ডিশন পরিষেবা চালুর উদ্যোগের কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, কয়েকটি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় এয়ার কন্ডিশনিং পরিকাঠামো তৈরি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। একইভাবে ক্যানসার হাসপাতালের পরিকাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অব্যবহৃত পরিকাঠামোকে দ্রুত রোগীদের পরিষেবায় কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, টানা তিনদিনের পরিদর্শনের পর রবিবারের বৈঠকে পূর্ব বর্ধমানের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিচ্ছন্নতা, জনবল, চিকিৎসা-যন্ত্র, রোগীদের খাবার, আবাসন, অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা এবং উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

