প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: দারিদ্রতা পরিবারের নিত্য দিনের সঙ্গী। রুটি রুজি জোগাড়ের জন্য বাংলায় বসত বাড়ি ছেড়ে বাবা মা চলে গিয়েছেন গুজরাটের আমেদাবাদে। সেখানে তাঁরা সাফাইকর্মীর কাজ করেন। এহেন এক পরিবারের মেধাবী ছাত্র সাগর মণ্ডল (Sagar Mondal) এবছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই আমেদাবাদে বাবা মায়ের কাছে চলে যায়। উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাড় করার জন্য সাগর আমেদাবাদে হোটেল বয়ের কাজে যোগ দেয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথেই প্রকাশ্যে আসে সাগরের অসামান্য কৃতীত্বের কথা। পূর্ব বর্ধমানের (Bardhaman) কালনা মহারাজা হাই স্কুলের ছাত্র সাগর মণ্ডল ৪৮৮ নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় নবম স্থান অধিকার করেছে। সাগরের এই অদম্য লড়াই বাংলার বহু ছাত্র ছাত্রীর কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাগর মণ্ডলের প্রাপ্ত নম্বরগুলি হল- বাংলায় ৯৬, ইংরেজিতে ৯৯, ভূগোলে ৯৮, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৯৬, অর্থনীতিতে ৯৯, ইতিহাসে ৮৭। সাগরের এই সাফল্য নিয়ে কালনা মহারাজা হাই স্কুলের (Kalna Maharaja Excessive College) প্রধান শিক্ষক মিলন মাণ্ডি বলেন, ‘অভাবী পরিবারের মেধাবী ছাত্র সাগর দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ওর জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।’
সাগর মণ্ডলের বাড়ি নদীয়ার শান্তিপুরের নৃসিংহপুরের বড়ডাঙ্গাপড়ায়। তবে বাবা মায়ের সঙ্গে সাগর এখন রয়েছে আমেদাবাদ হল্ট মেট্রো স্টেশন এলাকায়। সেখানেই একটা হোটেলে সে কাজ করছে। হোটেলে খাবার টেবিল পরিষ্কার করা, বাসনপত্র ধোয়া এবং হোটেল ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করতে হয় তাকে। সাগরের বাবা মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল একটি হোটেলে কাজ করেন। আর মা সুষমাদেবী আমেদাবাদের একটি হাসপাতালে সাফাইকর্মীর কাজ করেন। সুষমা দেবী এদিন জানান, রেজাল্ট নিতে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন।
সূষমাদেবী আরও জানান, অভাব তাঁদের সংসারে নিত্য দিনের সঙ্গী। দুই মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে যান তাঁরা। তাই ছেলে সাগরকে নদীয়ার বাড়িতে রেখে তিনিও স্বামী মৃত্যুঞ্জয় বাবুর সাথে আমেদাবাদে পৌছে যান। স্বামী একটা হোটেলে সাফাইয়ের কাজ নেন। আর তিনি আমেদাবাদের একটি হাসপাতালে সাফাইকর্মীর কাজ শুরু করেন।
এই প্রসঙ্গে সূষমাদেবী বলেন, “নদীয়ার গ্রামে দু’ কামরার ঘরে বাস করে নিজে রান্না করে খেয়ে রোজ ভাগীরথী পেরিয়ে কালনার স্কুলে যেত সাগর। ওর খাওয়া থেকে পড়াশোনা, সমস্ত খরচ চালানোর জন্য আমরা মাসে পাঁচ-ছ’ হাজার টাকা করে পাঠাতাম। তাতে নুন আনতে পান্তায় টান পড়ার দশা হত। তবে সৌভিক ঘোষ, জয় গোস্বামী-সহ কয়েকজন প্রাইভেট টিউটর সাগরের পাশে দাঁড়ান। কেউ বেতন নিতেনই না, কেউ নামমাত্র নিতেন।”
কৃতী ছাত্র সাগর জানিয়েছে ,তাঁর লক্ষ্য আইএএস হয়ে দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য দিল্লিতে ইগনুর ওপেন ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়ার পাশাপাশি ইউপিএসসির প্রশিক্ষণ নেবে বলেও জানায় সাগর।
