ঋদ্ধিমান চৌধুরী, ঢাকা: ঢাকার রাজপথে হাঁটলে এখন আর সেই পরিচিত ছবিটা চোখে পড়ে না। বছর দুয়েক আগেও যেখানে দেওয়াল জুড়ে মুজিব কোট আর ‘নৌকা’র ভিড় ছিল, আজ সেখানে শুধুই ধানের শিষ। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন (Bangladesh Election)। তার ঠিক আগে ঢাকার আকাশ-বাতাস যেন আগাম ফলাফল ঘোষণা করে দিয়েছে। আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি নয়া পল্টনে বিএনপির দপ্তরের সামনে। চারদিকে উৎসবের মেজাজ। এখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে গুলিস্তানে আওয়ামী লিগের (Awami League) সেই জাঁদরেল পার্টি অফিসটা এখন যেন এক ভূতুড়ে বাড়ি!
নয়া পল্টনে উৎসবের মেজাজ, বিএনপির (BNP) সদর দপ্তরের নীচতলায় তিলধারণের জায়গা নেই। দেদার বিক্রি জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের ছবি দেওয়া ব্যাজ, বই আর টি-শার্টের। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বললেন, ‘মানুষ গত ১৭ বছর ধরে এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল। খোলা মনে ভোট দেওয়ার জন্য তাদের হাত নিশপিশ করছে।’
মোড়ে মোড়ে বিশাল হোর্ডিং। খালেদা জিয়ার ছবির পাশে ‘দেশনায়ক’ তারেকের হাসিমুখের ছবি। তারেক দলের মধ্যমণি। তাঁর ‘৩১ দফা’ স্লোগান মুখে মুখে। কর্মীরা বলছেন, ‘ ভোট ডাকাতি নয়, এবার আসল খেলার দিন।’
গুলিস্তানে আসতেই দৃশ্যপট উলটো। যে আওয়ামী লিগের দপ্তরের সামনে হাঁটলে একসময় বুক দুরুদুরু করত, আজ সেই ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের নাম ‘শহিদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ’। ২০১৯ সালে নিহত সেই ছাত্রের নামেই এখন এই রাস্তা।
অফিসটার দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। স্থানীয়রা জানালেন, চত্বরটা রিক্সা আর টেম্পোর গ্যারাজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনের গায়ে পোস্টার, ‘আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ ও গণহত্যা গবেষণা কেন্দ্র’। একসময়ের প্রতাপশালী দলটির দম্ভ আজ ধুলোয় মিশে গিয়েছে। ফুলবিক্রেতা বললেন, ‘ভাইয়া, নৌকার কথা এখন কেউ মুখেও আনে না। ওটা অতীত।’
১৮ কোটি মানুষের এই দেশে এবার ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭০ লক্ষ। তবে নির্বাচনটা একটু আলাদা। ব্যালটে শুধু সংসদ নির্বাচন নয়, হবে সংবিধান সংস্কারের গণভোটও। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দু-বারের বেশি নয়, দ্বিকক্ষ সংসদ এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, এইসব দাবি নিয়েই ভোটে বিএনপি।
ঘটনা হল, শেখ হাসিনা দেশছাড়া, দলের শীর্ষ নেতারা জেলে, নয়তো পলাতক। মাঠে একা বিএনপি। জামায়াতে ইসলামি গর্জন করলেও ভোটঅঙ্কে তারা ধোপে টিকবে বলে মনে হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজি মহম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, ‘আওয়ামী লিগ না থাকায় ধর্মনিরপেক্ষ ভোটাররা বাধ্য হয়েই ধানের শিষে ভোট দেবেন। মানুষের ক্ষোভের বারুদ ফুরোয়নি।’
হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। তবে গয়েশ্বর রায় আত্মবিশ্বাসী, ‘সংখ্যালঘু বলে কিছু নেই, সবাই বাংলাদেশি। আমাদের পুজো-পার্বণ বেড়েছে। কেউ তো বাধা দিচ্ছে না!’ এক বিএনপি সমর্থক বললেন, ‘ভাই, আমরা শুধু শান্তি চাই। প্রতিশোধের রাজনীতি অনেক দেখেছি, এবার একটু নিঃশ্বাস নিতে চাই।’ ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বক্সে সেই নিঃশ্বাসের শব্দটাই হয়তো শোনা যাবে। দেওয়াল লিখন অন্তত সেটাই বলছে। নৌকাডুবি সম্পন্ন, এখন শুধু ধানের শিষের ঘরে ওঠার পালা।
