সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট: কারও পৌষমাস, তো কারও সর্বনাশ! বালুরঘাট শহরের তীব্র জলসংকটের আবহে এই প্রাচীন প্রবাদটিই এখন সবথেকে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আত্রেয়ী নদীর জলস্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় শহরে পানীয় জল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় মাইকিং শুরু করেছে পুরসভা (Balurghat Water Disaster)। আর পুরসভার এই ঘোষণায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হাহাকার বাড়লেও পোয়াবারো সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকার জল ব্যবসায়ীদের। শহরের তৃষ্ণা মেটাতে এখন প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার ড্রামবন্দি জল ঢুকছে গ্রাম থেকে। কার্যত চড়া দামে কেনা ওই ড্রামের জলেই এখন দিন কাটছে বালুরঘাটের কয়েক হাজার বাসিন্দার।
পুরসভার ৭৫ বছর পূর্তি হলেও এখনও শহরের ১০০ শতাংশ বাড়িতে পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছে দিতে পারেনি বালুরঘাট পুরসভা। বিশেষ করে চকভৃগুর তিনটি ওয়ার্ডে প্রকল্পের কাজই শুরু হয়নি। বাকি ২২টি ওয়ার্ডের ১৭ হাজার বাড়ির মধ্যে প্রায় ৪ হাজার বাড়িতে এখনও পৌঁছায়নি পুরসভার জল। যেখানে জল পৌঁছেছে, সেখানেও নদীর জল নাকি সুষ্ঠুভাবে পরিশোধন না করেই সরাসরি সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ তুলেছেন শহরের অনেক বাসিন্দা। তাই পুরসভার সরবরাহ করা জল পান করতে তাঁরা ভরসা পান না। ২ নম্বর ওয়ার্ডের গৃহবধূ মল্লিকা সরকার বলেন, ‘নদীর জল সরাসরি দেয় বলে শুনেছি। তাই পুরসভার সরবরাহ করা জল দিয়ে বাকি সব কাজ করলেও ওই জল খাই না। আমরা ড্রামের জল কিনে খাই।’ এই সুযোগেই ভাটপাড়া বা জলঘরের মতো গ্রামীণ এলাকা থেকে ২০ লিটারের ড্রাম ২০-৪০ টাকায় বিক্রি করে ব্যবসা জমিয়েছেন সাগর মহন্তর মতো ব্যবসায়ীরা। জল ব্যবসায়ী সাগরের কথায়, ‘এমনিতেই গরম পড়লে জলের চাহিদা বেশি থাকে। এর মধ্যে পুরসভা মাইকিং করতেই চাহিদা আরও বেড়েছে। শহরে ড্রামের জলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’
পুরসভা সূত্রে খবর, আত্রেয়ীর কংগ্রেস ঘাট সংলগ্ন জল উত্তোলন কেন্দ্রে জলস্তর এতটাই নীচে যে, পাম্প চালানো দুষ্কর হয়ে পড়ছে। অথচ শহরের দৈনিক সাড়ে আট লক্ষ গ্যালন জলের প্রয়োজন। জলস্তর নেমে যাওয়ায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট টাওয়ার থেকে দূরবর্তী এলাকায় জলের গতিও কমেছে। তাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
তবে কেবল জলের পরিমাণ নিয়ে সংকট নয়, জলের মান নিয়েও সমস্যায় রয়েছেন শহরের একটা বড় অংশের বাসিন্দা। বালুরঘাট শহরের চকভৃগু এলাকার তিনটি ওয়ার্ডে পানীয় জলপ্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। ওই এলাকার মানুষের পানীয় জলের জন্য কয়েকটি মেশিন বসানো রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে টিউবওয়েল ও পিএইচই’র টাইমকল। কিন্তু ওই টাইমকল দিয়ে মাঝে মাঝে ঘোলা জল বের হয় এবং জলের স্পিডও ততটা নয়। আবার বাড়িতে থাকা বা পুরসভার জলের সংযোগ দিয়েও আয়রনযুক্ত জল বের হয়। সেই জল তাই পান করতে চান না অনেকেই। যেমন চকভৃগু এলাকার কাউন্সিলার পল্লব দাস বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রচণ্ড আয়রনের জন্য ওই জল খাওয়া যায় না, তাই ড্রামের জল কিনে খাওয়া ছাড়া এলাকার বাসিন্দাদের কোনও উপায় নেই।’
একদিকে জলসংকট নিয়ে পুরসভার এই মাইকিং, আর সেইসঙ্গে জল ব্যবসায়ীদের রমরমা কারবার নিয়ে তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছে বালুরঘাট শহরে। একদল যখন রমরমিয়ে ব্যবসা করছে, তখন গরমে জলকষ্টে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। যদিও সংকট মেটাতে তৎপরতার দাবি করেছেন পুরসভার চেয়ারম্যান সুরজিৎ সাহা। তিনি বলেন, ‘জলসংকট এখনও তীব্র হয়নি। তবে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি পরিস্থিতি খারাপ হয়, সেই আশঙ্কা থেকেই আমরা মাইকে ওই সচেতনতামূলক প্রচার করেছি।’ তবে তাঁর আশ্বাস, ‘পানীয় জলের সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ জানালে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে আমরা শহরের প্রতিটি বাসিন্দাকে যতটা সম্ভব পরিষেবা দিতে বদ্ধপরিকর।’ তবে পুরসভার এই আশ্বাসে এখনই আশ্বস্ত হতে পারছেন না বালুরঘাটের অধিকাংশ বাসিন্দাই।
