সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট: সফল দাম্পত্যের চাবিকাঠি হল পরস্পরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা। এই রসায়নেই পরস্পরকে আঁকড়ে রেখেছিলেন কার্তিক মহন্ত এবং নিশিরানি মহন্ত। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাতেও তাই তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছয় দশক পেরিয়ে গিয়েছে অনায়াসে। মৃত্যুও যেন আলাদা করতে না পারে, জীবদ্দশায় পরস্পরকে বলতেন স্বামী-স্ত্রী। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা যে কতটা ছিল, তার সাক্ষী থাকল বালুরঘাট (Balurghat Aged Couple Dying) শহর। অলৌকিকভাবে রবিবার রাতে স্ত্রীর মৃত্যুর এক ঘণ্টার মধ্যে মারা গেলেন স্বামীও। ‘প্রেম সপ্তাহে’ যেন অন্যভাবে নিজেদের ভালোবাসার চিহ্ন রেখে গেলেন কার্তিক-নিশি।
জীবদ্দশায় তাঁরা ছিলেন একসঙ্গে। মরণের পরেও পাশাপাশি সমাধিস্থ হওয়ার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে ৯৬ বছরের কার্তিক ও ৮৬ বছরের নিশির। দুজনের দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসা দেখেছে বালুরঘাট (Balurghat) শহর লাগোয়া ভাটপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের নামাবঙ্গী এলাকা। তাই দুজনের এক ঘণ্টার ব্যবধানে মৃত্যুতে তেমন হতবাক নন আত্মীয় এবং পড়শিরা। তাঁদের ভালোবাসার কাছে এ যেন স্বাভাবিকই ছিল। তাঁরা বলছেন, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস এতটাই ছিল যে, কোনও কারণে মনোমালিন্য ঘটলেও, তা মিটে যেত কয়েক মিনিটের মধ্যে। দীর্ঘ সংসার জীবনে অনুকূল ও প্রতিকূল পরিস্থিতি, তাঁরা সামলেছেন একসঙ্গে। বয়সকালে রিকশা চালিয়ে সংসারের জোয়াল টেনেছেন কার্তিক। তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে সংসার প্রতিপালনে যোগ্য সংগত দিয়েছেন নিশি। শুধু রিকশা চালানোয় নয়, তিনি সিটু অনুনোদিত রিকশা-ভ্যান ইউনিয়নের দক্ষ সংগঠকও ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। স্ত্রী তাঁকে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন জায়গায়।
কয়েকদিন আগে অসুস্থতার জন্য নিশিকে ভর্তি করতে হয়েছিল হাসপাতালে। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে বাড়িতে মনমরা হয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন কার্তিক। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে স্বামীকে খাইয়ে দিয়েছিলেন স্ত্রী। রবিবার দুপুরেও স্ত্রী নিশির হাতে পরম যত্নে খাবার খেয়েছেন কার্তিক। রাতে ঘুমের মধ্যে কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় কার্তিকের। পাশেই স্ত্রীর বিছানাকে ঘিরে আত্মীয়দের কান্নাকাটির শব্দ শুনে বোঝেন, স্ত্রী নেই। সেই শোক আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি কার্তিক। কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু হয় তাঁর। একসঙ্গে দম্পতির মৃত্যুর খবরে রবি রাতেই ভিড় জমে যায় মহন্তবাড়ির উঠোনে। দম্পতির ছেলে চন্দন বলেন, ‘বাবা ও মায়ের ভালোবাসার রসায়নটাই ছিল আলাদা। তাই মায়ের মৃত্যুর কিছুক্ষণ পরেই বাবা মারা যায়।’
সোমবার দম্পতির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সিটুর শ্রমিক-কৃষক ভবনে, শেষ শ্রদ্ধা জানান প্রচুর মানুষ। এরপর চকভবানী শ্মশানে পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হয় কার্তিক-নিশিকে। নাতজামাই তপু বিশ্বাস বললেন, ‘নিজের চোখে ওই বৃদ্ধ দম্পতির বোঝাপড়া দেখেছি। দাদুশ্বশুর হাঁটাচলা করতে না পারায় ঘুরতে বা কোথাও যেতে হলে তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত দিদাশাশুড়ি। প্রতিদিন নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া, যত্ন করা, সবই করত। তাই দুজনের একসঙ্গে চলে যাওয়া, ভালো হয়েছে।’
