পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: বালুরঘাটের (Balurghat) হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন কারাগারটি বহু বছর আগেই বদলে গিয়েছিল জেলা মিউজিয়ামে। ১৯১০ সালে স্থাপিত এই ঐতিহাসিক ভবনটির রূপান্তর হয় ২০০৪ সালে। সেই থেকে জেলার ইতিহাসের সাক্ষ্যবহনকারী অসংখ্য প্রত্নসামগ্রীর ঠিকানা হয়ে উঠেছে মিউজিয়ামটি। তবে আজ পর্যন্ত এই মিউজিয়ামে (Museum) কোনও কিউরেটর নেই। সংগ্রহশালার বিপুল সম্পদ সামলানোর জন্য কর্মীসংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে মাত্র একজন গ্যালারি অ্যাটেনডেন্ট ও একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী মিউজিয়ামের সমস্ত কাজ সামলাচ্ছেন। তবে বর্তমানে এই ভবনের সংস্কার শুরু হয়েছে, আর সেই কারণেই আপাতত বন্ধ রয়েছে এটি। পূর্ত দপ্তরের তত্ত্বাবধানে দ্রুতগতিতে চলছে কাজ। প্রশাসনের আশা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন সাজে খুলে যাবে মিউজিয়াম।
সংস্কারের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই তৈরি হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার স্কোয়ার ফুটের জায়গাজুড়ে এক আধুনিক গ্যালারি। গড়ে তোলা হচ্ছে শৌচালয়, পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য থাকছে ভিতরে ঘোরার রাস্তা। মূল ভবন ও প্রাচীরের বহু জায়গাই ভগ্নপ্রায় অবস্থায় ছিল, সেগুলোরও সংস্কার চলছে। নতুন করে তৈরি হচ্ছে নিকাশি ব্যবস্থা। তবে সংগ্রহশালার বিপুল সম্পদ সামলানোর জন্য কর্মীসংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে মাত্র একজন গ্যালারি অ্যাটেনডেন্ট ও একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী মিউজিয়ামের সমস্ত কাজ সামলাচ্ছেন। ইতিহাসবিদদের দাবি, এত বড় সংগ্রহশালাকে ঠিকঠাক পরিচালনা করতে কর্মী বাড়ানো জরুরি।
ইতিহাস গবেষক ডঃ সমিত ঘোষ বলেন, ‘মিউজিয়ামে একজন কিউরেটর দরকার। এখানে পাল, সেন, গুপ্ত যুগের বুদ্ধমূর্তি এবং সূর্য, বিষ্ণু, মনসা, অর্ধনারীশ্বর ও নবগ্রহের মূর্তি রয়েছে। সুলতানি যুগের তামা ও রুপোর অনেক মুদ্রা রয়েছে। তালপাতার পুঁথি, বিভিন্ন জমিদারির সময়কার দলিল, খাজনা রসিদ, টেরাকোটার কাজ রয়েছে। ঐতিহাসিক স্তম্ভের ভগ্ন প্রস্তর, উড মুরাল, স্টোন রেলিকস আছে। এত প্রত্নতত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও মিউজিয়ামের কোনও ক্যাটালগ নেই, যা অবশ্যই দরকার।’
জেলার বিভিন্ন প্রান্ত, হরিরামপুর, গঙ্গারামপুর, কুশমণ্ডি, কুমারগঞ্জ, তপনে প্রায়ই পুকুর খননের সময়ে মাটির নীচ থেকে উঠে আসে মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। সেগুলোর সিংহভাগই এখন শোভা পাচ্ছে এই মিউজিয়ামে। স্কুল পড়ুয়াদের শিক্ষামূলক ভ্রমণ, গবেষকদের নিয়মিত অধ্যয়ন, সব মিলিয়ে এটি জেলার ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা শাসক বালাসুব্রহ্মনিয়ান টি বলেন,‘পূর্ত দপ্তরের তরফে পুরো মিউজিয়াম সংস্কারের কাজ চলছে। দায়িত্বভার নেওয়ার পরে আমি কাগজপত্র দেখেছি। অনেক অভ্যন্তরীণ কাজ হচ্ছে। দর্শনার্থীদের জন্য শৌচালয়, জলের ব্যবস্থা ছিল না, সেগুলো করা হচ্ছে। কাজ শেষে মিউজিয়াম খুললে প্রবেশমূল্য বৃদ্ধির কোনও কথা এখনও হয়নি।’
বর্তমানে মিউজিয়াম খোলা থাকে সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং শনিবার দুপুর ২টো পর্যন্ত। প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। আগের জেলা শাসকের উদ্যোগে স্কুল পড়ুয়ারা বিনামূল্যে প্রবেশের সুবিধা পায়।
সব মিলিয়ে এখন জেলার ইতিহাসকে সামনে আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। নতুন অবকাঠামো ও পরিবর্ধিত প্রদর্শনী নিয়ে আরও সমৃদ্ধ রূপে ফের শুরু হতে চলেছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা মিউজিয়াম।
