উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর পার হয়ে গেছে ১২৫টি দিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর শেষকৃত্য (Ayatollah Ali Khamenei funeral) এতদিন স্থগিত রেখেছিল ইরান সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো—দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনও ধরনের রাসায়নিক বা ‘এম্বামিং’ (chemical embalming) পদ্ধতি ছাড়াই কীভাবে তাঁর মৃতদেহ সম্পূর্ণ অবিকৃত রাখা হলো?
সাধারণত দীর্ঘ সময়ের জন্য মৃতদেহ সংরক্ষণে বিভিন্ন শক্তিশালী রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ইসলামি আইন অনুযায়ী মৃতদেহে এ ধরনের রাসায়নিকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। খামেনেইয়ের ক্ষেত্রে ধর্মনীতির প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখেই এক অভিনব পথ বেছে নেয় ইরান, যা আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদেরও (forensic consultants) চমকে দিয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহার করে ‘হাই-প্রিসিশন মেডিকেল কোল্ড স্টোরেজ’ (high-precision refrigeration) বা অত্যাধুনিক চিকিৎসা-হিমঘর প্রযুক্তি। অত্যন্ত গোপনীয় একটি স্থানে কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মাত্র ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তাঁর মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়। ফলে কোনও কেমিক্যাল ছাড়াই দেহটি প্রাকৃতিকভাবে পচন থেকে রক্ষা পায়।
কেন এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একইসঙ্গে বহির্বিশ্বের চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা (geopolitical pressure) এবং নিরাপত্তার অভাবের কারণে জাতীয় স্তরে এই বিশাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার পর তবেই শেষকৃত্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অবশেষে তেহরানের ইমাম খোমেনি শ্রাইনে (Imam Khomeini Shrine) আয়োজিত শেষ শ্রদ্ধানুষ্ঠানে লাখো মানুষের ঢল নামে। শোকের আবহে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। আগামী ৬ জুলাই তেহরানে মূল জানাজা শেষে ৭ জুলাই তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হবে পবিত্র শহর ক্বোমে। সবশেষে, ৯ জুলাই মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে (Imam Reza mausoleum) তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। এই ঐতিহাসিক শেষ বিদায়ে অংশ নিতে বিশ্বের প্রায় ৯০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রতিনিধিরা ইরানে পৌঁছেছেন। বিজ্ঞান, ধর্ম এবং ভূ-রাজনীতির এমন অভাবনীয় সংমিশ্রণ আধুনিক ইতিহাসে বিরল, যা খামেনেইয়ের এই দীর্ঘ ১২৫ দিনের অন্তিম যাত্রাকে একটি রহস্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত করেছে।

