রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কতটা বিপদ ডেকে আনে তা কমবেশি সবারই জানা। কিন্তু তা কিনে রেখে বাড়িতে ফেলে রাখাটাও যে বিপদ ডেকে আনছে তা ক’জনে জানেন! হেঁয়ালি বলে মনে হচ্ছে?
মডেল রুরাল হেলথ রিসার্চ ইউনিট (এমআরএইচআরইউ)–এর নোডাল অফিসার ডাঃ সন্দীপ মুখোপাধ্যায় সেই হেঁয়ালি দূর করছেন, ‘বিভিন্ন অসুখের জন্য মানুষ বাড়িতে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে রাখে। পড়ে থাকায় সেগুলির একটি বড় অংশই অনেক সময় ব্যবহার করা হয় না। পরে সেগুলিকে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়।’ সেই ওষুধ ডাম্পিং গ্রাউন্ডে গিয়ে অন্যান্য ব্যাকটিরিয়ার সঙ্গে মিশে গিয়ে সেগুলিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।’ হালে যেভাবে নানা ব্যাকটিরিয়ার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে তাতে এই পর্যবেক্ষণ যে যথেষ্টই আশঙ্কাজনক তাতে কোনও সন্দেহ নেই বলেই সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে (Antibiotic Waste Administration)।
উত্তরবঙ্গের মানুষের রোগভোগ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং গবেষণার মাধ্যমে রোগের শিকড়ে পৌঁছাতে এমআরএইচআরইউ কাজ করছে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) স্বীকৃত উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এই গবেষণাকেন্দ্র ইতিমধ্যেই গবেষণামূলক কাজ শুরু করেছে। গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য সহ নানা নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে। শুক্রবার এখানে এসে আইসিএমআর-এর কলকাতাস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ ইন ব্যাকটিরিয়াল ইনফেকশনের (এনআইআরবিআই) ডিরেক্টর ডাঃ শান্তসবুজ দাস বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে ১২টি প্রকল্প নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। গবেষণাগারে নানা আধুনিক যন্ত্রপাতি বসানো হচ্ছে।’
আইসিএমআর দু’বছর আগে এই হাসপাতালে এমআরএইচআরইউ চালুর ছাড়পত্র দেয়। কলকাতার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কলেরা অ্যান্ড এন্টারিক ডিজিজ (নাইসেড)–কে এই কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নাইসেডই বর্তমানে এনআইআরবিআই–এ উন্নীত হয়েছে। মেডিকেলে স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে ভবন হস্তান্তরের পর এই ইউনিট তৈরি করতে বেশ কিছুদিন সময় লেগেছে। তবে, এরই মধ্যে এখানকার গবেষকরা সমতল থেকে পাহাড় ঘুরে মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্ত সহ অন্যান্য নমুনা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করছেন।
এনআইআরবিআই–এর ডিরেক্টর দিনভর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে বৈঠক করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনসংখ্যাভিত্তিক স্বাস্থ্য সমীক্ষায় জোর দেওয়া হয়েছে। ফাঁসিদেওয়া ব্লকের ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ এবং তাঁদের রক্ত সহ অন্যান্য নমুনা পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে।’ রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই অ্যানিমিয়ার স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। মূলত একজনের মুখমণ্ডল দেখেই প্রাথমিকভাবে অ্যানিমিয়া চিহ্নিত করা হচ্ছে। তার পরে সন্দেহজনক রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করতে হচ্ছে। অপুষ্টি বা অন্য কোনও কারণে অ্যানিমিয়া হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এমআরএইচআরইউতে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। প্রতিটি ওষুধের দোকানেই বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক মেলে। আর তাতেই বিপদ ঘনাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এমআরএইচআরইউ–এর নোডাল অফিসার ডাঃ সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘মানুষ তো বটেই মাছ–মাংসেও প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হচ্ছে। এসব আখেরে মানুষের প্রচুর ক্ষতি করছে।’ অ্যান্টিবায়োটিক বাড়ির আবর্জনার সঙ্গে মিশে নদীতে পৌঁছে সেখানকার ব্যাকটিরিয়াগুলিকে শক্তিশালী করে তুলছে বলে উত্তরবঙ্গের অন্যতম চিকিৎসক শেখর চক্রবর্তীর বক্তব্য। তাঁর কথায়, ‘পরে সেই ব্যাকটিরিয়ায় কেউ আক্রান্ত হলে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কাজ করছে না।’ প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি অব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে ধ্বংস করা প্রয়োজন বলে শেখরের দাবি।
এনআইআরবিআই ডিরেক্টর বললেন, ‘ওষুধপত্র ফেলার জন্য বাড়িতে পৃথক কনটেনারের ব্যবস্থা করলে কতটা সুফল মিলবে তা গবেষণায় দেখা হচ্ছে।’ পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাফল্য মিললে ভবিষ্যতে এটি প্রতিটি রাজ্যেই চালু হবে।’
