মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া: প্রক্রিয়া শুরুর সাড়ে চার বছর পর ২৮ লক্ষ টাকায় সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। তারও সওয়া দু’বছর পর ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে উদ্বোধন হয় প্রকল্পটির। কয়েকমাস পর বীরপাড়ার দুটি এলাকার আবর্জনা সরানোর কাজ শুরু হয়। আর তার মাসখানেক পরই বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই কাজও। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আবর্জনা সাফাইয়ে রাজ্য সরকারের খরচ করা ২৮ লক্ষ টাকায় এটাই ‘প্রাপ্তি’ বীরপাড়া ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের।
দীর্ঘদিন ধরে আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) বীরপাড়ার (Birpara) লোকালয়গুলিই যেন ডাম্পিং গ্রাউন্ড। আলিপুরদুয়ার বা শিলিগুড়ির দিক থেকে ৪৮ নম্বর এশিয়ান হাইওয়ে ধরে বীরপাড়ায় ঢুকতে চৌপথির কাছাকাছি এলে নাকে রুমাল দিতেই হয় মানুষকে। কারণ, হাইওয়ের দু’পাশেই আবর্জনার স্তূপ। বীরপাড়ার যিশু এক্কা বলছেন, ‘গেরস্থালির আবর্জনা থেকে শুরু করে মরা প্রাণী, সবই ফেলা হয় হাইওয়ের পাশে।’ স্থানীয় বাসিন্দা তথা ফিজিওথেরাপিস্ট নাগেন্দ্রপ্রতাপ সিংয়ের বক্তব্য, ‘হাইওয়ের পাশে পচা আবর্জনার স্তূপ বাইরের মানুষের কাছে বীরপাড়ার ভাবমূর্তি খারাপ করছে। লোকালয়ে আবর্জনা পোড়ানো হচ্ছে। প্লাস্টিকজাত সামগ্রী পোড়ানোর ধোঁয়া ফুসফুসের ক্ষতি করছে। আবর্জনা চিবোচ্ছে গোরুর পাল। ওই গোরুর দুধ দুইয়ে বিক্রি করা হচ্ছে এলাকায়। ওই দুধ পান করেও শরীরে খারাপ প্রভাব পড়ছে।’
দীর্ঘদিন ধরে বীরপাড়ার বাসিন্দারা ডাম্পিং গ্রাউন্ড কিংবা সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোজেক্ট তৈরির দাবি জানাচ্ছিলেন। ২০১৮ সালে ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরিতে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করলেও জমিজটে টাকা ফেরত যায়। ২০২০ সালের গোড়ায় মাদারিহাট-বীরপাড়া পঞ্চায়েত সমিতি ও বীরপাড়া-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে ফের কাজ শুরু হয় গ্যারগান্ডা নদীর তীরে। জায়গাটি তাদের দাবি করে কাজ রুখে দেয় শিশুঝুমরা গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ। ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিরবিটি নদীর তীরে প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু হয়। প্রথম ধাপে খরচ করা হয় ২৮ লক্ষ টাকা। তবে দ্বিতীয় ধাপের টাকা বরাদ্দ না হওয়ায় আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণের যন্ত্রপাতি আনা হয়নি। গত বছর ৩ মার্চ প্রকল্পের ডাম্পিং গ্রাউন্ডের উদ্বোধন করেন আলিপুরদুয়ারের জেলা শাসক আর বিমলা, মাদারিহাটের বিধায়ক জয়প্রকাশ টোপ্পোরা।
এর কিছুদিন পর সুভাষপল্লির চারটি পার্ট থেকে আবর্জনা সরানোর কাজ শুরু হয়। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে রবীন্দ্রনগরের দুটি পার্টের আবর্জনা সরানোর কাজ শুরু হয়। তবে অক্টোবর মাস থেকে আবর্জনা সরানোর কাজ বন্ধ। লোকালয় থেকে ডাম্পিং গ্রাউন্ড পর্যন্ত আবর্জনা নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি কয়েকটি টোটো পড়ে রয়েছে। বীরপাড়া-১ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সুচিত্রা মল্লিক বলেন, ‘টোটোচালকরা কাজ ছেড়ে দেওয়াতেই সমস্যা হচ্ছে। আমরা বিকল্প চিন্তাভাবনা করছি।’ মাদারিহাট-বীরপাড়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি আশা এস বোমজান বলেন, ‘আবর্জনা সাফাই বন্ধ হওয়ায় জনগণ ক্ষুব্ধ। এনিয়ে রবিবারই মাদারিহাটের জয়েন্ট বিডিওর সঙ্গে কথা বলেছি।’
তবে উপপ্রধান আশকুমার তামাং বলছেন, ‘টোটোচালকদের মজুরি সহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ প্রশাসন থেকে টাকা পায় না। তাই আবর্জনা সরানোর কাজ বন্ধ রয়েছে।’ এছাড়া প্রকল্প তৈরির দ্বিতীয় ধাপের টাকাও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন উপপ্রধান।
ওই প্রকল্পে জৈব আবর্জনাগুলি থেকে সার এবং অজৈব উপাদানগুলি থেকে অন্যান্য সামগ্রী তৈরির কথা। আরএসপির বীরপাড়া লোকাল কমিটির সম্পাদক বিকাশ দাস বলছেন, ‘বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণে পঞ্চায়েতের আন্তরিকতা প্রয়োজন। ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে নেতারা কাটমানি খাওয়ার ধান্দা করলে প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়বেই।’ আরেক বাসিন্দা তথা সিপিএমের আলিপুরদুয়ার জেলা কমিটির সদস্য জয়ন্ত চিকবড়াইক বলছেন, ‘লোকালয় থেকে আবর্জনা সরানোর কাজ বন্ধ। বীরপাড়ার পঞ্চায়েত প্রধান এবং ব্লক প্রশাসনকে দলের তরফে এনিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। বীরপাড়ার জনপ্রতিনিধিদের এনিয়ে আন্তরিকতা নেই। ওই প্রকল্পের টাকাও নয়ছয় করা হয়েছে।’ তৃণমূলের মাদারিহাট-বীরপাড়া ব্লক কমিটির সহ সভাপতি রাজীব মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘কাটমানির তত্ত্ব ভিত্তিহীন। আবর্জনা সাফাইয়ে ব্যর্থতার দায় পঞ্চায়েত প্রধানের।’
এদিকে, সুভাষপল্লি, কলেজপাড়ায় দিনের পর দিন আবর্জনা জমছে। রবীন্দ্রনগর, দেবীগড়ে আবর্জনার স্তূপ। শরৎ চ্যাটার্জি কলোনি এলাকায় দিনবাজারের আবর্জনা ফেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আবর্জনায় মজে গিয়েছে নিকাশিনালাগুলি। চৌপথি, পুরোনো বাসস্ট্যান্ড, লেভেল ক্রসিং এলাকায় আবর্জনা পুড়িয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢাকছে এলাকা। বীরপাড়া-১ গ্রাম পঞ্চায়েতে ২৮টি পার্ট রয়েছে। এগুলির মধ্যে শহর বীরপাড়ায় রয়েছে ১৯টি। পুরসভার আদলে ওই ১৯টি মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে টোটোগুলি আবর্জনা সংগ্রহ করবে, জানিয়েছিল পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ। এজন্য বাড়ি বাড়ি পচনশীল এবং অপচনশীল আবর্জনা জমা করতে দুটি করে কনটেনার দেওয়া হয়েছিল। তবে নিট ফল শূন্য।
