শুভঙ্কর চক্রবর্তী
তিতলি এবং বেলা দুই বোনের চিৎকারে ভরদুপুরে গোটা বাড়ি মাথায় উঠেছে। একেই অসহ্য গরম তার ওপর দুজনের ঝগড়ায় রাগে গজগজ করতে থাকেন শিপ্রা। কটমট করে তাকান তিতলির দিকে, ‘খাওয়া হয়ে গিয়েছে, এখন যদি চুপচাপ না ঘুমিয়ে পড়িস তাহলে কাউকেই আস্ত রাখব না’। ধমক খেয়ে গুটিশুটি হয়ে মেঝেতেই শুয়ে পড়ে তিতলি। বেলা লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে যায়।
ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে শ্যাডোকে জলের বোতল আনতে বলেন শিপ্রা। বাধ্য মেয়ের মতো মুখে করে জলের বোতল এনে ল্যাজ নাড়তে শুরু করে শ্যাডো। শিলিগুড়ির প্রধাননগরে বাঘা যতীন কলোনির ২/২ লেনের এক কামরার ছোট্ট সংসারে তিনজন মানুষের সঙ্গে সাত পথকুকুরের বাস। ওই বাড়িতে ভাড়া থাকেন শিপ্রা বিশ্বাস। বৃদ্ধ বাবা, মা ছাড়াও শ্যাডো, ভলু, তিতলি, বেলা, হানি, গদু এবং চিকু- সাত সন্তানকে নিয়েই সুখে-দুঃখে দিন কাটে শিপ্রার। বছর দশেক আগে শ্যাডো এবং ভলুকে দত্তক নিয়েছিলেন তিনি। বাকিরা ওই দম্পতিরই সন্তান। শিপ্রার কথার অবাধ্য হয় না কেউই। বরং জলের বোতল এনে দেওয়া, দরজা বন্ধ করা- টুকটাক কাজও করে দেয়।
আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে লেখা ঋগবেদের দশম মণ্ডলে বর্ণিত সরমার সঙ্গে শ্যাডোর কোথাও যেন মিল রয়েছে। সরমা ছিল দেবতাদের কুকুর, আসলে কুক্কুরী বা মেয়ে কুকুর। একদল ডাকাত (পণী) দেবলোক থেকে গোরু চুরি করে পালিয়েছিল। ইন্দ্রের নির্দেশে সরমা সেই ডাকাতদের ডেরা খুঁজে বের করে। পরে দেবতারা সেখান থেকে গোরু উদ্ধার করেছিলেন। কারও কারও মতে, পৃথিবীর সব কুকুরই আসলে সরমার সন্তান। তাই তাদের বলা হয় সারমেয়। দেবতাদের পাশাপাশি বিশ্বস্ত বন্ধু হিসাবে মানুষের জন্যও সেই আদিকাল থেকে কাজ করছে সারমেয়রা।
জার্মানিতে সরমার উত্তরসূরিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিবেশ রক্ষার কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। সেখানে রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন রাখা সহ নানা কাজ করছে পথকুকুররা। প্রাণী বিশেষজ্ঞ, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সরকার উদ্যোগ নিয়ে পথকুকুরদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছে। রাস্তায় পড়ে থাকা বোতল মুখে তুলে কীভাবে সেন্সরযুক্ত বাক্সে ফেলতে হবে, কীভাবে অন্য বর্জ্য পরিষ্কার করতে হবে তা শেখানো হচ্ছে। তারপর আবর্জনা সংগ্রহকারী হিসাবে প্রশিক্ষিত কুকুরদের কাজে লাগানো হচ্ছে।
মানুষের সঙ্গে কুকুরের সহাবস্থান যে সামাজিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এবং পথকুকুরের সমস্যার সৃজনশীল সমাধান যে সম্ভব তা প্রমাণ করে দিয়েছে জার্মানি। সেদেশের কোনও কোনও শহরে পথকুকুরদের ‘কর্মরত কুকুর’ হিসাবে দত্তক নিচ্ছেন সাধারণ মানুষজন। দত্তকের জন্য অনুষ্ঠান হচ্ছে। শহর পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য পুরস্কৃতও হচ্ছে পথকুকুররা। পুরস্কার হিসাবে তাদের দেওয়া হচ্ছে নানা উপাদেয় খাবার। নিয়মিত পথকুকুরদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার বন্দোবস্তও করেছে সরকার।
তবে জার্মানি যা পারে ভারতেও কি তা সম্ভব? প্রশ্ন শুনে হাসলেন শিপ্রা। বললেন, ‘যদি সদিচ্ছা থাকে আর ভালোবাসা দেওয়া যায় তাহলে সবই সম্ভব। সেনাবাহিনী, পুলিশে প্রশিক্ষিত কুকুররা যদি শত্রুর মোকাবিলা করতে পারে, তাহলে সাধারণ পথকুকুর ছোট ছোট বহু কাজ খুব সহজেই করতে পারবে। তারজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’ বিশিষ্ট পশু চিকিৎসক সুখদেব সরকারও মনে করেন পশ্চিমবঙ্গেও জার্মানির অনুকরণ বাস্তবায়িত করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। তাঁর কথা, ‘আমাদের অমানবিক আচরণের ফলে পথকুকুররা মানুষদের শত্রু ভাবে। আগে ওদের বন্ধু হতে হবে। ওদের ভালোবাসতে হবে। ধাপে ধাপে ওদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে তারপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাহলে শুধু রাস্তা পরিষ্কার নয়, পথকুকুররা আরও বিস্ময়কর অনেক কাজ করে দিতে সক্ষম।’
পথকুকুরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যে অভিজ্ঞ করে তোলা যায় সেই ভাবনা বাংলায় নতুন নয়। বেদ, পুরাণের বহু যুগ পরে কলকাতায় বসে সত্যজিৎ রায় তাঁর অসমঞ্জবাবুর নেড়ি ব্রাউনিকে ইংরেজিতে আদেশ করার প্রশিক্ষণ দিতে চেয়েছিলেন। লিখেছিলেন, ‘স্ট্যান্ড-আপ, সিট ডাউন, শেক হ্যান্ড, এসব বললে যদি কুকুর মানে তা হলে বেশ হবে।’ সত্যজিতের সেই ভাবনাতেও ছিল উত্তরবঙ্গ। কারণ ভবানীপুর থেকে হাসিমারায় এসেই শখের ব্রাউনিকে পেয়েছিলেন অসমঞ্জবাবু। ব্রাউনিদের রক্ষায় তাঁরাও পথ দেখাতে চান বলেই জানিয়েছেন কলকাতার মেয়র এবং রাজ্যের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। তাঁর বক্তব্য, ‘পথকুকুরদের সমস্যা একদিনে মিটে যাবে না। মানুষের সঙ্গে তাদের সহাবস্থান আরও সহজ করতে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। পথকুকুরদের প্রতি সহ নাগরিকরা সহানুভূতিশীল না হলে বাস্তবে কিছু করা সম্ভব নয়।’ শিলিগুড়ি পুরনিগমের ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকারের কথা, ‘জার্মানি যা করেছে, চেষ্টা করলে তা আমরাও করতে পারব। ধাপে ধাপে সেই কাজে এগোতে হবে। প্রাথমিকভাবে শিলিগুড়িতে সেই কাজ শুরু হয়েছে। পথকুকুরদের জন্য হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সব ঠিক হলে প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।’
‘ব্যবহার অযোগ্য পশু’ হিসাবে চিহ্নিত করে পথকুকুরদের উপর লাগাতার অত্যাচার এবং কলকাতা শহরকে কুকুরশূন্য করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কুকুরদের বিদ্রোহের কথা লুব্ধক-এ লিপিবদ্ধ করেছেন নবারুণ ভট্টাচার্য। তবে সৃষ্টির আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত তারা যে ‘ব্যবহার অযোগ্য’ নয় বারবার তার প্রমাণ দিয়েছে সারমেয়কুল। তাই তাদের রক্ষায় রাস্তায় নেমেছেন বহু মানুষ। যেমনভাবে বুদ্ধের জন্মান্তরের কাহিনী ‘জাতক মালা’-তে রাজার ক্রোধ থেকে বারাণসীর পথকুকুরদের রক্ষাকারী হিসাবে দেখা গিয়েছিল স্বয়ং কুকুররূপী বোধিসত্ত্বকে। পথের বিশ্বস্ত সঙ্গী কুকুরকে ছেড়ে স্বর্গে প্রবেশ করতে রাজি হননি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। জার্মানিও কুকুর ত্যাগের বিরুদ্ধে। ইতিহাস বা বর্তমান থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ বা রাজ্য কুকুর-মানুষের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানে নজর দিক তেমনটাই চাইছেন পশুপ্রেমীরা।
The submit ভালোবাসাই বদলাবে সারমেয়-মন appeared first on Uttarbanga Sambad.
