প্রণব সূত্রধর, আলিপুরদুয়ার: মোবাইল ফোনে আসক্তি ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্কদের। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নাবালিকারাই। সমাজমাধ্যমে পরিচিতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং তার জেরে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে নাবালিকারা অনেকসময় যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ দেখেছে, বেশিরভাগ সময়ই বাবা-মা মেয়ের এই সম্পর্কের বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলায় গত দুই বছরের পকসো মামলার পরিসংখ্যান পুলিশ এবং শিশু সুরক্ষা কমিটিকে ভাবাচ্ছে। আলিপুরদুয়ার আদালতে ২০২৪ সালে জেলায় প্রায় ১৬০টি পকসো মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যাটা প্রায় ১৪৮। আলিপুরদুয়ারে সিডব্লিউসি-র চেয়ারম্যান অসীম বসু বলেন, ‘বিভিন্ন সময় নাবালিকাদের উদ্ধারের পর কাউন্সেলিং করা হয়। সেই সময়ই প্রেমজনিত কারণে ঘর ছাড়ার বিষয়টি সামনে আসছে। অনেক সময় শারীরিক পরীক্ষার পর গর্ভবতী হয়ে পড়ার প্রমাণ মিলছে। মামলা হলেও ওই নাবালিকা পরবর্তীতে সামাজিক সমস্যার মুখে পড়ছে।’
পুলিশ এবং সিডব্লিউসি সূত্রেই জানা গিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা নাবালিকাদের উদ্ধারের পর শারীরিক পরীক্ষা করার সম্মতি দেন না। সেক্ষেত্রে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লেও তা প্রশাসনের কাছে নথিভুক্ত হয় না। সুতরাং বাস্তবে নথিভুক্ত কেসের তুলনায় যৌন নিগ্রহের শিকার নাবালিকার সংখ্যা আরও বেশি।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নীলাদ্রি নাথের কথায়, ‘বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়। কয়েকদিনের পরিচয় থেকে সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সময় অভিভাবকদের মতামতের তোয়াক্কা না করে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ওই নাবালক বা নাবালিকা। ঠিক-ভুলের বিষয়টি তারা বুঝতে চায় না অনেক সময়। স্বাধীনতাও চায়। তাই ছেলেমেয়ে মোবাইলে কী করছে, সে ব্যাপারে নজর রাখতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। তারা কী করছে, কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, সেসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখা উচিত। তাছাড়া তাদের মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।’
অনেকক্ষেত্রে সমাজমাধ্যমে (Social Media) পরিচয় গোপন রেখে পাচারের ফাঁদ পাতা হলেও নাবালিকারা তা বুঝতে পারে না। পরিচয় থেকে প্রেম, তারপর শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তারা। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। অনেক সময় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ দেবযানী সেনশর্মা বলেন, ‘অনেক সময় নাবালিকারা গর্ভনিরোধক ওষুধ খাচ্ছে। সার্চ ইঞ্জিন ঘেঁটে ওষুধ কিনে নিচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে দেখা যায়। জিজ্ঞাসাবাদ করলে অল্প বয়সে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কের কথাও জানায় তারা। এতে পরবর্তীতে রক্তাল্পতাজনিত সমস্যা ছাড়াও বন্ধ্যাত্বজনিত রোগ দেখা দিতে পারে।’
আলিপুরদুয়ার জেলায় জয়গাঁ ও ফালাকাটায় (Falakata) দুটি পৃথক শিশু ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল। সেই মামলা এখনও আলিপুরদুয়ার আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ধর্ষণ ও খুনের মতো ঘটনা খুব বেশি না হলেও পকসো মামলায় নাবালিকাজনিত ঘটনাই বেশি। আলিপুরদুয়ার নিউটাউন গার্লস স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা কুসুমিকা মৈত্র মনে করেন, ‘অভিভাবকদের শক্ত হাতে বিষয়টি দেখতে হবে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অভিভাবকরা অসহায়। মোবাইল আসক্তির ফলে অনেক পড়ুয়ার শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে দেখেছি। প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে নাবালিকাদের ঘরছাড়া ও গর্ভবতী হয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগজনক।’ সিডব্লিউসি-র প্রাক্তন চেয়ারপার্সন ডোরা ভট্টাচার্যর কথায়, ‘বিভিন্ন সময় দেখেছি মোবাইলের মাধ্যমে পরিচয় তারপর সমস্যার সূত্রপাত। মোবাইলের ভালো দিক গ্রহণ না করে খারাপ দিকটা বেছে নেওয়ার প্রবণতায় নাবালিকাজনিত সমস্যা ক্রমশ বাড়বে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরাও জানেন না ছেলেমেয়ে মোবাইলে কী করছে। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।’
