নীহাররঞ্জন ঘোষ, মাদারিহাট: রাত জেগে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। কঠিন সমস্ত বিষয় সহজে আয়ত্ত করেছেন। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর হয়েছেন। কিন্তু পরিশ্রমের সুফল? মেলেনি। যে হাতে চক-ডাস্টার ওঠা বা নানা সমস্যার সমাধানে হাতের যে আঙুলগুলির কম্পিউটারের কিবোর্ডে গতি তোলার কথা ছিল, তাঁরা আজকাল চা বাগানে পাতা তোলা বা কীটনাশক স্প্রে’র মতো কাজে ব্যস্ত। এটা রাজেশ নার্জিনারি, মদন দাসদের মতো অনেকেরই গল্প। আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) ফালাকাটা (Falakata) ব্লকের শালকুমার গ্রাম পঞ্চায়েতের খাউচাঁদপাড়ার সুপ্রিয়া চা বাগানের ঘটনা। রাজেশরা অবশ্য শুধুমাত্র যে এই বাগানেই রয়েছেন তা নয়, ভালোভাবে খোঁজ করলে ডুয়ার্সের আরও অনেক বাগানে এমন মদনদের এই উপাখ্যানের খোঁজ মিলবে। প্রচুর পড়াশোনা শেষে করায়ত্ত করা সমস্ত সার্টিফিকেট আজকাল বাড়িতে স্রেফ ফাইলবন্দি।
খাউচাঁদপাড়ার বাসিন্দা রাজেশ নার্জিনারির কথায় আসা যাক, ‘১৯৯১ সালে সুপ্রিয়া চা বাগানটি গড়ে ওঠে। বাবা জমির বিনিময়ে বাগানে পাতা তোলার চাকরি পেয়েছিলেন। অবসরের পর বাবার পরিবর্তে যে চাকরি পাবে, শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হবে বলে তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।’ রাজেশের ক্ষেত্রে সেই আশ্বাস রাখা হয়নি। ‘এমএ পাশ করলাম। অনেক সরকারি দপ্তরে চাকরির আবেদন করেছিলাম। কিছু হয়নি। অন্যদিকে, মালিক বাবাকে যে আশ্বাস দিয়েছিলেন তা রাখেননি। বাবার অবসরের পর এই বাগানে আমি এখন কীটনাশক স্প্রে’র কাজ করছি।’ মদন দাসেরও একই গল্প। জমি বাগান কর্তৃপক্ষকে দিয়ে তাঁর বাবাও এখানে চাকরি পেয়েছিলেন। পরিবারের যিনি পরে এই বাগানে চাকরি করবেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী তাঁকেও চাকরি দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই আশ্বাস ১০ বছরেও শেষপর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। স্নাতক হওয়ার পর মদন বেশ কয়েক জায়গায় আবেদন করেও চাকরি পাননি। শেষপর্যন্ত সুপ্রিয়া চা বাগানে পাতা তোলার কাজ মেলে। সেই কাজ করে দিন শেষে সামান্য যে ক’টা টাকা মেলে তাই দিয়ে তাঁর সংসার চলে। তরুণ হতাশ, ‘শুধু আমি একাই নয়, আমার মতো এই বাগানের আরও আটজন একই পরিস্থিতির শিকার।’
সেই দলে বিশ্বজিৎ দাস, কৃষ্ণা দাস, গৌরাঙ্গ দাস, অজয় দাস, অসীম দাস, রাকেশ দাসরা আছেন। সবাই স্নাতক। যত্ন করে সমস্ত পড়াশোনা করলেও আখেরে তা জীবনে কাজে না লাগায় খুবই হতাশ। বিশ্বজিতের কথায়, ‘বাবা যখন অবসর নিলেন তখন বাগানে একটা ভালো কাজ জুটবে বলে খুবই আশায় ছিলাম। খুব আশা করে কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু যখন শুনলাম আমাকে স্রেফ পাতা তোলার কাজ করতে হবে তখন খুবই ভেঙে পড়ি।’ আশা ছিল, বাগানের অফিসে কোনও কাজ পাবেন। কিন্তু তা না জোটায় রোজগারের কোনও উপায় না থাকায় বিশ্বজিৎ অবশ্য শেষপর্যন্ত সেই কাজটিকেই আঁকড়ে ধরতে বাধ্য হন। রাজেশের মতো তিনিও ১০ বছর ধরে বাগানে চা পাতা তোলার কাজ করে চলেছেন। অসীমদের তবু স্নাতক হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। পরিমল দাসের হয়নি। ১৯৯২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর অর্থাভাবে সেখানেই পড়াশোনায় ইতি। তারপর থেকে বাগানেই চা পাতা তোলার কাজ করে চলেছেন। আজও। জীবন কবে বদলাবে? রাজেশ থেকে পরিমল, কারও জানা নেই।
