সোনাপুর: পরিবর্তনের হাওয়ায় দলবদল হয়েছে বটে, কিন্তু বদলায়নি চেনা সংস্কৃতি। স্থান সেই চেনা আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) পাতলাখাওয়া (Patlakhawa)। উপলক্ষ্য সেই শিলতোর্ষা নদী। আর নেপথ্য কারণ? নদীগর্ভের বালি-পাথরের চোরাকারবার ও গাড়ি পিছু তোলা আদায়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। বুধবার সেই টাকার ভাগাভাগি এবং এলাকা কার দখলে থাকবে তা নিয়ে প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়াল বিজেপির দুই গোষ্ঠী। বচসা থেকে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে রীতিমতো হাতাহাতির উপক্রম হয়। শেষমেশ সোনাপুর ফাঁড়ির পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিড় ছত্রভঙ্গ করে।
আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের পাতলাখাওয়া এলাকায় শিলতোর্ষা নদী ও সংলগ্ন অঞ্চলের দখলদারি নিয়ে বিবাদের ইতিহাস নতুন নয়। বিগত দিনে এখানে বারবার তৃণমূলের (TMC) গোষ্ঠীকোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। রাজ্যে পালাবদলের পর পাতলাখাওয়ার বাসিন্দারা বুক বেঁধেছিলেন হয়তো এবার এই সিন্ডিকেট ত্রাস থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উলটো ছবি। ঘাসফুলের জায়গায় এখন বুক ফুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পদ্ম শিবিরের সিন্ডিকেট।
বিবাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দত্তের বান এলাকা। মহাসড়ক সম্প্রসারণের কাজের জন্য নদী থেকে বালি ও পাথর তোলার বরাত পেয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। অভিযোগ, কাজ নির্বিঘ্নে চালাতে ওই ব্যবসায়ীরা স্থানীয় বিজেপি নেতাদের মদত নিয়েছেন। এমনকি সেই সিন্ডিকেটে শামিল হয়েছেন এলাকার বেশ কিছু প্রাক্তন তৃণমূল নেতা-কর্মীও। সিন্ডিকেটের কাজ হল নদী থেকে বালিবোঝাই গাড়িগুলি যাতে নির্বিঘ্নে গ্রামের রাস্তা দিয়ে মূল সড়কে উঠতে পারে, তা সুনিশ্চিত করা। বিনিময়ে গাড়ি প্রতি ২৫০ টাকা করে তোলা ধার্য করা হয়েছে। যে গ্রামীণ জমির ওপর দিয়ে গাড়ি যাবে, সেই জমির মালিকদেরও টাকার একটা অংশ দেওয়ার টোপ দেওয়া হয়েছিল।
বুধবার এই সমীকরণ ঘিরেই বেঁধে যায় ধুন্ধুমার। স্থানীয় অপর একটি শিবিরের দাবি, তাদের জমির ওপর দিয়ে গাড়ি গেলেও তাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। এই বঞ্চিত গোষ্ঠীর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় বিজেপিরই অন্য একটি গোষ্ঠী। তাদের আবার পালটা সিন্ডিকেট রয়েছে। মহাসড়কের কাজের জন্য প্রতিদিন কয়েকশো গাড়ি যাতায়াত করে। এই বিপুল অঙ্কের টাকার ভাগ কোনও পক্ষই ছাড়তে নারাজ। ফলে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে মাঠ ছাড়তে হুঁশিয়ারি দিলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। এক গোষ্ঠীর নেতারা আবার দায় এড়াতে অন্য গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তুলে বলছেন, এর পিছনে তৃণমূলের সুড়সুড়ি রয়েছে। যদিও সাধারণ মানুষের বক্তব্য, পুরোটাই ভাগাভাগির লড়াই।
বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে গোষ্ঠীকোন্দলের তত্ত্ব খাড়া করতে নারাজ। দলের জেলা সহ সভাপতি মানিক সাহার কথায়, ‘ওখানে ব্যবসা করা নয়, কয়েকজনের মধ্যে সমস্যা হয়েছে। সেখানে দলের বিষয় নেই। জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যা।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তৃণমূল আমলে যে কারবার কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল এবার সেটা হবে না। বৈধ মতে যাঁরা ব্যবসা করতে চান, তাঁরা করতে পারেন।’ অন্যদিকে, দলের জেলা যুব মোর্চার সভাপতি রূপন দাস বলেন, ‘ওখানে কোনও গোষ্ঠীকোন্দলের বিষয় নেই। ব্যবসায়ীদের সমস্যা। বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হবে।’ নেতাদের সাফাই যাই হোক না কেন, পুলিশের হস্তক্ষেপে এ যাত্রায় বড়সড়ো অশান্তি এড়ানো গেলেও, পাতলাখাওয়ার আকাশে ফের যে সিন্ডিকেটের চেনা মেঘ ঘনাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

