আলিপুরদুয়ার: ধনতেরাসের আগে সোনার দোকানে লাগাতার চলছে ‘রেইকি’! নির্দিষ্ট কোনও এক জায়গায় নয়। আলিপুরদুয়ার শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় প্রতিটি দোকানেই চলছে এই ঘটনা। ভিড় ঠেলে দোকানের ভেতরে ঢুকে রীতিমতো খোঁজখবর নিয়ে বেরিয়ে আসছেন ‘ওঁরা’। বাইরে বন্দুকধারী নিরাপত্তারক্ষী থাকলেও আটকানো যাচ্ছে না।
না, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ চুরি-ডাকাতি বা নিদেনপক্ষে সিনেমার শুটিংয়ের রেইকি নয়। এই রেইকি চালাচ্ছেন ক্রেতারা। সোনার গয়না কেনার আগে এখন দোকানে দোকানে ঘুরে দাম-দর, কোথায় কী অফার চলছে, জানতে উপচে পড়ছে ভিড়। এছাড়া উপায়ই বা কী? দশ গ্রাম গয়না সোনার দাম ছাড়িয়েছে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকার গণ্ডি। অনেকেই মানছেন, এখন তো আর সেই দিন নেই। এখন গয়না কেনার আগে ভালো মতন খোঁজখবর নিয়ে রাখতে হয়। না হলে যে কোনও সময় টান পড়তে পারে মধ্যবিত্তের পকেটে।
শহরের বাসিন্দা ফাল্গুনী রায়, বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চলেছেন আগামী অগ্রহায়ণে। বুধবার বিকেলে মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলেন গয়নার দোকানে। হাসতে হাসতে বললেন, ‘এখন তো একটা হার কিনতে গেলেও বাজেটের কথা মাথায় রাখতে হয়। তাই কিছু কেনার আগে তিনদিন দোকান ঘুরে দেখছি। কোথায় একটু কম দরে ভালো ডিজাইনের গয়না পাওয়া যায়- সেটাই খুঁজছি।’ তাঁর মায়ের সংযোজন, ‘আগে গয়না কেনায় আনন্দ ছিল। এখন হিসেবনিকেশের চাপে সেই আনন্দ উধাও হয়েছে।’
একই দৃশ্য দেখা গেল আলিপুরদুয়ারের নিউটাউন এলাকায়। সেখানে সুমনা ও বীরেন পোদ্দার এসেছিলেন হবু বৌমার জন্য নোয়া বাঁধানো ও নেকলেস দেখতে। বীরেন বললেন, ‘এখন সোনার দাম এমন জায়গায় পৌঁছেছে, না চাইলেও বাজেটের কথা মাথায় চলেই আসে। ধনতেরাসের সময় কিছুটা ছাড় মেলে। এই সুযোগে গয়না দেখা শুরু করেছি। আশা করছি, অফার থাকায় অন্তত কিছু সাশ্রয় হবে।’
ধনতেরাসের বিশেষ ছাড়ও মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিতে পারছে না। কারণ, যতই অফার থাক, সোনার দাম ক্রমশ চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। গয়না ব্যবসায়ী নিখিল সরকার বললেন, ‘এখন ক্রেতারা খুব হিসেব করে চলেন। আগে ১২ গ্রাম সোনায় হার বানাতাম। এখন ১০ গ্রামের মধ্যেই সারার চেষ্টা করছেন ক্রেতারা। একেকটা বিয়েতে গয়নার বাজেট থাকছে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকার মতো। অনেকে পুরোনো সোনা দিয়ে নতুন গয়না নিচ্ছেন। এতে খরচ কিছুটা সামলানো যায়।’
আরেক দোকানি উত্তম সরকার বলেন, ‘ধনতেরাস মানে শুভসূচনা। মানুষ চান, ওই দিন মূল্যবান কিছু না কিছু কেনার রেওয়াজ বজায় রাখতে। তাই আংটি থেকে শুরু করে পাতলা নেকলেস, বিক্রি হচ্ছে দেদার। কিন্তু দাম বাড়ায় অনেকে আগের মতো কেনাকাটা করেন না।’
তবে বিক্রেতাদের তরফেও চলছে ক্রেতা টানার নানা আপ্রাণ চেষ্টা। কেউ ‘মেকিং চার্জ’-এ ৫০% ছাড় দিচ্ছেন। কেউ আবার পুরোনো গয়না বদলে নতুন গয়নায় বাড়তি অফার দিচ্ছেন। দোকান সাজানো হয়েছে আলোর মালা, ফুল দিয়ে। ভরপুর উৎসবের আমেজ। তবে ক্রেতাদের মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ। শহরের বাসিন্দা অর্পিতা ঘোষ বলেন, ‘বিয়ের মরশুম আসছে। এখন না কিনলে পরে দাম আরও বাড়বে।’
কিন্তু সোনা তো সোনাই, সে তার যতই দাম হোক। ধনতেরাসের দিন হাতে নতুন গয়নার ঝলক দেখে খুশি হন ক্রেতা। কারণ, বিশ্বাস। শুভ দিনে কেনা সামান্য সোনাও ঘরে আনে সৌভাগ্য।
