মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁচ লাগল ভারতের সাধারণ মানুষের হেঁশেলে। আমেরিকা-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে এখন জ্বালানি সংকট। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ইরান বিধিনিষেধ আরোপ করায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের শৃঙ্খল বিপর্যস্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হুহু করে বাড়লেও কেন্দ্রীয় সরকার এখনও পেট্রোল বা ডিজেলের জোগান নিয়ে বড় বিপদ মানছে না।
কিন্তু রান্নার গ্যাসের জোগানে অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে। গ্যাসের সিলিন্ডারপিছু ইতিমধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে। সিলিন্ডার বুকিংয়ে ২৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এলপিজি, সিএনজি-র উত্পাদন বাড়ানোর ফরমান জারি করেছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আওতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে এলপিজি, সিএনজিকে।
সরকারের অবশ্য দাবি, গ্যাসের জোগান পর্যাপ্তই রয়েছে। কিন্তু সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। যদি জোগান পর্যাপ্তই হয়ে থাকে, গ্যাসের সিলিন্ডার পেতে গ্রাহকদের নাভিশ্বাস উঠছে কেন- সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। বিশ্বের মোট তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের বড় অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান এই জলপথে বিধিনিষেধ আরোপ করায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের আমদানিতে।
ভারত তার প্রয়োজনের সিংহভাগ এলপিজি আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সেখানে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ভারতের সরবরাহ ব্যবস্থায় টান পড়েছে। তেল শোধনাগারগুলিতে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় এলপিজি এবং সিএনজি উত্পাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাতে ছবিটা বিন্দুমাত্র বদলায়নি। পরপর দুটি বুকিংয়ের মাঝে ২৫ দিনের ব্যবধান রাখতে কেন্দ্রের নির্দেশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
দেশে কতটা গ্যাস মজুত রয়েছে, আন্তর্জাতিক সংকটে সেই মজুত ভাণ্ডারের কতটা কাজে লাগতে পারে- সেই প্রশ্নও তুলেছেন তৃণমূল নেত্রী। রাজনীতির আকচা-আকচি যেমনই হোক, গ্যাসের এই সংকটে মানুষের স্মৃতিতে ফিরে এসেছে নোটবন্দি এবং করোনাকালের চেনা ছবি। নোটবন্দির সময় পুরোনো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট জমা দিয়ে ২ হাজার টাকার গোলাপি নোট নেওয়ার জন্য মানুষকে ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল।
করোনাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হয়েছিল। ইরানে যুদ্ধের কারণে এখন সিলিন্ডারের জন্য গ্যাসের দোকানের বাইরে ভিড় করতে হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের বিকল্প বর্তমানে বেশিরভাগ পরিবারের হাতেই নেই। কেরোসিন স্টোভ, ইন্ডাকশন বা কাঠকয়লার উনুনে রান্নাবান্না করেন- এমন মানুষের সংখ্যা সীমিত।
তাছাড়া বড় পরিবার বা হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্কুলের মিড-ডে মিল, আইসিডিএস কেন্দ্র, হাসপাতালে গ্যাস ফুরিয়ে গেলে কী হবে- সেটা সবথেকে বড় প্রশ্ন। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের আকাশছোঁয়া দাম এবং অমিল হওয়ায় বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা মুম্বইয়ের মতো বড় শহরগুলোতে রেস্তোরাঁ ও হোটেল ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম। কলকাতার ছবিটা তথৈবচ।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে। এই সংকট নিরসন এখন সরকারের সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, অত্যাবশকীয় পণ্য আইনের কঠোর প্রয়োগে রান্নার গ্যাস, সিএনজি-র কালোবাজারি রোধ। অনেক জায়গায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চড়া দামে গ্যাস বিক্রি অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার খোঁজ। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্য দেশ থেকে গ্যাস আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। পাশাপাশি, দেশের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ থেকে জরুরিভিত্তিতে জোগান বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। তৃতীয়ত, অনলাইন বুকিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কারও একার হাতে নেই। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং আগাম পরিকল্পনা অবশ্যই সরকারের থাকা উচিত। যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্বহীন করে রাখা যায় না।
