হাতকে বাদ দিয়েই হবে ইন্ডিয়া জোট

হাতকে বাদ দিয়েই হবে ইন্ডিয়া জোট

শিক্ষা
Spread the love


রন্তিদেব সেনগুপ্ত

মাত্র দেড় বছর আগে পরস্পরের হাত ধরে যে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা মাঠে নেমেছিলেন, সেই তাঁরাই এখন বলছেন এই জোট ভেঙে দেওয়া হোক। কারণ, জোট তার কার্যকারিতা হারিয়েছে।

জোটের নেতারা খুব খুশি মনে বা একত্রে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই কথা বলছেন এমন নয়। প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো করে বলছেন। কিন্তু প্রত্যেকের বক্তব্যের সারাংশ এক।

জোটের অন্যতম শরিক ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা বলেছেন, এই জোটের কোনও কর্মসূচি নেই। কোনও বৈঠক হয় না। এর নেতা কে কেউ জানে না। এই জোট ভেঙে দেওয়াই ভালো। জোটের আর এক নেতা শিবসেনার সঞ্জয় রাউত বলেছেন, কংগ্রেসের দায়িত্ব ছিল জোটকে জিইয়ে রাখা। সকলের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করা। কিন্তু একটাও বৈঠক ডাকা হয়নি। এখন মনে হচ্ছে ইন্ডিয়া জোটের কোনও অস্তিত্বই নেই। মহারাষ্ট্রের পুরভোটে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে চলার সিদ্ধান্তও নিয়েছে শিবসেনা। অখিলেশ যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তেজস্বী যাদবের মতো নেতারা এত স্পষ্টভাবে না বললেও, হাবেভাবে তাঁরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন এই ইন্ডিয়া জোট নিয়ে তাঁরা যথেষ্ট হতাশ। বরং কংগ্রেসকে বাদ রেখে নিজেদের মতো বোঝাপড়া করে এগোতেই তাঁরা আগ্রহী।

তবে সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি সাফ সাফ বলে দিয়েছেন, কংগ্রেস বিজেপির এজেন্ট হিসেবে কাজ করে দিল্লিতে আপকে হারাতে চাইছে। কংগ্রেসও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। দিল্লির নির্বাচনি লড়াইয়ে নেমে তাদের নেতারা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে দেশবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন।

এইসবের ভিতরে আবার মারাঠা কুলপতি শারদ পাওয়ারের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। দল ছেড়ে এনডিএ জোটে চলে যাওয়া ভাইপো অজিত পাওয়ারের সঙ্গে ইদানীং তাঁর আবার স্নেহের সম্পর্ক প্রকাশ্যে এসেছে। অজিতের মা, অর্থাৎ শারদের ভ্রাতৃবধূ বলেছেন, তিনি কাকা-ভাইপোর মিলন দেখতে চান। এরপরই প্রকাশ্য সভায় শারদ বিজেপি-আরএসএসের প্রশংসা করেছেন। এমনও হাওয়ায় ভাসছে যে শারদ-কন্যা শীঘ্রই ফড়নবিশ-শিন্ডে-অজিতদের সঙ্গে হাত মেলাবেন এবং মহারাষ্ট্রে মন্ত্রী হবেন। জীবনের প্রান্তবেলায় কোন খেলা খেলার জন্য শারদ পাওয়ার প্রস্তুত হচ্ছেন কৌতূহল তা নিয়ে।

এই রকম একটি পরিস্থিতিতে ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। দেড় বছর আগে তৈরি হওয়া এই জোটটি আর কতদিন টিকবে সেটিই দেখার। গতিপ্রকৃতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে এখন মনে হচ্ছে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের পরই এই জোটের গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটবে। ইন্ডিয়া জোটের গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটলে জাতীয় রাজনীতিতে কি আর বিরোধী জোটের অস্তিত্ব থাকবে না? যাঁরা ভাবছেন ইন্ডিয়া জোটের পাট গোটানোর সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী জোটও অস্তাচলে যাবে— তাঁদের সেই ভাবনাটিও ঠিক নয়। বরং যে সম্ভাবনাটি দেখা যাচ্ছে তা হল– কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, ন্যাশনাল কনফারেন্স, তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি এবং শিবসেনার মতো শরিকদের নিয়ে একটি নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। যে জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন একটি জোট। যে জোটে ডিএমকের মতো দক্ষিণের রাজনীতিতে একটি শক্তপোক্ত শরিক ছাড়া সিপিএমের মতো জাতীয় রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক কিছু ছোট শরিক বাদ দিলে আর কেউই কংগ্রেসের সঙ্গে থাকবে না। বলাই বাহুল্য সেটি অনেক কমজোরি একটি জোট হবে। দেড় বছর আগে সংঘবদ্ধ যে জোটের চেহারা দেখা গিয়েছিল, সেটি এবার দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন, জোট যদি ভেঙে যায় তার দায় কার ওপর বর্তাবে? একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, যে জোট শরিকরা এখন মুখ খুলতে শুরু করেছে তাদের প্রত্যেকেরই অভিযোগের তির কংগ্রেসের দিকে। জোটের নেতৃত্ব কংগ্রেসের হাতে থাকলে এই জোটের কোনও ভবিষ্যৎ নেই এইরকম কথাই তাঁরা বলছেন। ইতিমধ্যেই জোটের নেতৃত্বের পরিবর্তন তাঁরা চেয়েছেন।

জোট শরিকরা যে খুব ভুল কিছু বলছেন তা কিন্তু নয়। ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্বদানে কংগ্রেসের যে অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল তা কংগ্রেস নেয়নি। বরং জোট শরিকদের বক্তব্যের পালটা কংগ্রেস নেতা পবন খেড়া, সুপ্রিয়া শ্রীনতেরা বলছেন, নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ইন্ডিয়া জোট তৈরি হয়েছিল। এখন কংগ্রেস রাজ্যে রাজ্যে তাদের শক্তিবৃদ্ধি করার চেষ্টা করবে। তাতে দরকার হলে রাজ্য বিধানসভাগুলির নির্বাচনে তারা আলাদা লড়াই করবে। কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য, কংগ্রেস কোনও এনজিও নয়।

শুধুমাত্র একটি নির্বাচনে জেতার জন্য ইন্ডিয়া জোট তৈরি হয়েছিল, এবং নির্বাচন মিটে যাওয়ার পর এই জোট নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে— এই যদি কংগ্রেস নেতৃত্বের মনোভাব হয়, তাহলে বলতেই হচ্ছে, বিজেপির মতো একটি ধুরন্ধর সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন দলের বিরুদ্ধে সার্বিক লড়াই করার মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি বিরোধী জোট গড়ে তোলার ইচ্ছা কংগ্রেস নেতাদের আদৌ ছিল না। আর কংগ্রেস যদি ভেবে থাকে লোকসভায় ৯৯টি আসন দখল করে তারা এখন একক ক্ষমতায় বিজেপির মোকাবিলা করার অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে, তাহলে সেই ভাবনাটিও ভুল। কংগ্রেস নেতারা ভুলে যান যে তাঁদের এই ৯৯টি আসনের পিছনে জোট শরিকদের অবদানও রয়েছে। ইন্ডিয়া জোট গঠিত না হলে কংগ্রেস লোকসভায় পঞ্চাশটি আসনের গণ্ডিও পেরোতে পারত না। এটাই বাস্তব।

কংগ্রেসের আসল সমস্যাটি তার মানসিকতায়। এটি শরিক নেতারা বুঝতে পেরেছেন। কংগ্রেস মানসিকতা না বদলালে তাঁদের পক্ষেও যে কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘদিন পথ চলা সম্ভব নয় সেটাও উপলব্ধি করেছেন তাঁরা। কংগ্রেস অনেকটা জলসাঘরের সেই জমিদার বিশ্বম্ভরের মতো। যাঁর জমিদারি গিয়েছে, কিন্তু জমিদারের মেজাজটা যায়নি। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে রাহুল গান্ধি অনেক আশা জাগিয়ে শুরু করেছিলেন। আশা করা গিয়েছিল, তিনি এই মানসিকতা থেকে কংগ্রেসকে বের করে আনবেন। তুচ্ছতাচ্ছিল্য নয়, শরিকদের সম্মান দিতে শেখাবেন কংগ্রেস নেতাদের। জোট রাজনীতি করার যে মানসিকতা সেটি তিনি দেখাবেন। কিন্তু সেই মানসিকতা তাঁর ভিতরও দেখা গেল না। বরং দেখা গেল, তিনি ও পথ মোটেই মাড়ালেন না।

এখন যা অবস্থা, তাতে ইন্ডিয়া জোট ভেঙে দু’টুকরো হচ্ছেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা। হয়তো দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের পরেই সেই ভাঙন আরও দ্রুত হবে।

রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, কংগ্রেসকে বাদ রেখে ইন্ডিয়া জোট নতুন করে তৈরি করা, বা ইন্ডিয়া জোট থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন বিরোধী জোট গড়া- এ নিয়ে কিছুদিন ধরেই সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, শিবসেনা, আপ, আরজডি’র মতো দলগুলি নিজেদের ভিতর মতবিনিময় করছে। এরা প্রত্যেকেই মনে করছে, কংগ্রেসের মুখ চেয়ে ইন্ডিয়া জোট আঁকড়ে থাকার অর্থ সময় নষ্ট করা। যে কারণেই এরা নিজেদের ভিতর একটি পারস্পরিক সমঝোতা করে এগোতে চাইছে। তার প্রতিফলন দিল্লি নির্বাচনে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে তৃণমূলের সমর্থন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে অখিলেশ, তেজস্বীরা জোর সওয়াল করেছেন। কংগ্রেস যা বুঝতে চায়নি বা বুঝতে পারেনি তা এই শরিক নেতারা বুঝেছেন। ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই ফল।

ইন্ডিয়া জোট যদি ভাঙে তাহলে ক্ষতি কার সবথেকে বেশি হবে? অবশ্যই কংগ্রেসের। বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের এখন যা সাংগঠনিক অবস্থা তাতে খুব বেশি উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং পরের লোকসভা নির্বাচনে ৯৯ থেকে ৪০, এমনকি তিরিশেও পতন হতে পারে কংগ্রেসের।

উলটোদিকে মমতা-অখিলেশ-তেজস্বী-কেজরিওয়াল-শিবসেনার নেতৃত্বাধীন নতুন জোট যদি আরও কিছু শরিককে সঙ্গে জুটিয়ে বিজেপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে, যা হয়তো একেবারেই অসম্ভবও নয়, তাহলে রাহুল গান্ধির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা একেবারেই জলাঞ্জলি দিতে হবে। কারণ, ইতিমধ্যেই রাহুল নয়, মমতাকে জোটের নেতা দেখতে চেয়ে সরব হয়েছেন শরিক নেতারা।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *