রুমি বাগচী
প্যারিস অলিম্পিকের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে টম ক্রুজের সেই রোমাঞ্চকর বাইক স্টান্টের কথা মনে আছে? আইফেল টাওয়ার পেরিয়ে তাঁর হাত ধরে অলিম্পিকের পতাকা এসে পৌঁছেছিল স্বপ্নের শহর লস অ্যাঞ্জেলেসে। তবে শুধু অলিম্পিক নয়, তার আগেই ফিফাও তাদের ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছে এই হলিউড নগরীকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটি স্পোর্টিং ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ পাওয়া সত্যিই এক বিরল সৌভাগ্যের। লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্ষেত্রে এই প্রাপ্তি অবশ্য যোগ্যতারই পুরস্কার। এখানকার জীবনযাত্রার খরচ বা ‘কস্ট অফ লিভিং’ আকাশছোঁয়া। ট্যাক্স থেকে শুরু করে বাড়ি বা গাড়ির জ্বালানি— সবকিছুর চড়া দাম সামলে যাঁরা হাড়ভাঙা পরিশ্রমে দিন গুজরান করেন, এই বিশ্বমানের ক্রীড়া উৎসব তাঁদের জন্য এক দারুণ মানসিক পাওনা।
শিলিগুড়ির মতো শান্ত মফসসল থেকে জীবন শুরু করে আজ বিশ্বকাপের এই শহরে থিতু হওয়াটা যেন স্বপ্নের মতো। আজও স্পষ্ট মনে পড়ে শিলিগুড়িতে পাড়ার সবাই মিলে গোল হয়ে বসে চ্যাঁচামেচি করে বিশ্বকাপ দেখার সেই দিনগুলো। গ্যালারির বিদেশি দর্শকদের বৈচিত্র্য আর ঝলমলে আধুনিক স্টেডিয়াম দেখে আমরা গোগ্রাসে সেই আধুনিকতা গিলতাম। আজ যখন লস অ্যাঞ্জেলেসের রাস্তায় হাঁটি, মন বিশ্বাস করতে চায় না যে— যে পথে আমি রোজ বাজার করি, সেখানেই কয়েকদিন পর এমবাপে, মেসি বা রোনাল্ডোর মতো ফুটবল দেবতারা হেঁটে বেড়াবেন! হয়তো হলিউডের ‘ওয়াক অফ ফেম’-এ ওঁরাও ছবি তুলবেন। ওই কয়েকটা দিন আমরা লস অ্যাঞ্জেলেসবাসী আর বিশ্বতারকারা একই আকাশের নীচে এক শহরবাসী হয়ে থাকব, ভাবতেই শিহরণ হয়।
মহাযজ্ঞের প্রস্তুতির আসল রূপটি অবশ্য পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। শহরকে বিশ্বমঞ্চের জন্য প্রস্তুত করতে স্টেডিয়ামের পরিকাঠামো বা যাতায়াত ব্যবস্থার যে নিঃশব্দ উন্নয়ন চলে, তা অনেকটা মহীরুহের মাটির তলার শিকড়ের মতো; ফুলগুলো সবাই দেখে, কিন্তু লড়াইটা অজানাই থাকে। ২০০২ সালের পর এবারই প্রথম কানাডা, আমেরিকা ও মেক্সিকো— এই তিন দেশ মিলে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। ৩২টির বদলে এবার খেলবে ৪৮টি দল, ম্যাচ হবে ১০৪টি। আগের সব বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের আয়োজন বহুগুণ বড়। এই বিশাল সূচির ৭৮টি ম্যাচই হবে আমেরিকায়, যার মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলেসের ভাগে পড়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৮টি ম্যাচ। এমনকি আমেরিকার উদ্বোধনী ম্যাচটিও হবে এই ‘লা লা ল্যান্ডে’।
লস অ্যাঞ্জেলেসের বিখ্যাত সোফাই স্টেডিয়ামে বসবে বিশ্বকাপের অন্যতম মূল আসর। এখানকার মাঠ তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক ঘাস আর সিন্থেটিক টার্ফের নিখুঁত সংমিশ্রণে গড়া হাইব্রিড কার্পেট দিয়ে। মূল আকর্ষণ হল আস্ত ফুটবল মাঠের চেয়েও বড় ‘ইনফিনিটি ডিসপ্লে স্ক্রিন’। চারতলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু এবং আট কোটি পিক্সেলের এই স্ক্রিন ৩৬০ ডিগ্রি সিনেমাটিক ভিজুয়াল অভিজ্ঞতা দেবে। প্রযুক্তির দিক থেকেও এবারের বিশ্বকাপ অনন্য। পুরো গ্যালারিতে বসানো ২৬০টি স্পিকার আর ডজন খানেক ক্যামেরা ম্যাচটিকে আক্ষরিক অর্থেই ‘লাইভ ভিডিও গেম সিমুলেশন’-এ পরিণত করবে।
সোফাই স্টেডিয়ামের স্থাপত্যও আরেক বিস্ময়। মূল কাঠামোটি ভূমি স্তর থেকে প্রায় ১০০ ফুট নীচে হওয়ায় স্টেডিয়ামের ভেতরটা প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা থাকে। আর ওপরের স্বচ্ছ ছাদ দিয়ে দর্শকরা খোলা আকাশ দেখার সুযোগ পান। ৭০ হাজার মানুষের সমবেত চিৎকার যখন মাটির নীচের এই স্টেডিয়ামে প্রতিধ্বনিত হবে, তখন তা পৃথিবীর বৃহত্তম মিলনমেলায় পরিণত হবে। মাঠের বাইরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ টিভির পর্দায় এই উন্মাদনা প্রত্যক্ষ করবেন। লস অ্যাঞ্জেলেস এখন পুরোপুরি তৈরি, বিশ্বজয়ের এই মেগা উৎসবের জন্য আপনারা রেডি তো?
(লেখক লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দা। শিলিগুড়ির ভূমিকন্যা।)
