শিলাজিৎ সরকার: দোসরা নভেম্বরের মায়ারাতের পর থেকে ভারতে নতুন জোয়ার এসেছে মহিলা ক্রিকেট নিয়ে। হরমনপ্রীত কৌর-স্মৃতি মন্ধানা-রিচা ঘোষদের সাফল্যে পাগলপারা আসমুদ্রহিমাচল। অর্ধেক নয়, এবার পুরো আকাশের দাবিদার হবেন জেমাইমা রডরিগেজ-শেফালি বর্মারা, শোনা যাচ্ছে দেশের অলিগলিতে।
তবে সেই স্রোতে এখনই গা ভাসাতে রাজি নন শান্তা রঙ্গস্বামী। এদেশের মহিলা ক্রিকেটের প্রথম অধিনায়কের মতে, সমানাধিকারের লক্ষ্যে এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে। অন্তত আরও দু’টো ধাপ পার হতে হবে। কোন কোন ধাপ? শান্তার মতে, ঘরোয়া ক্রিকেটে আর্থিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে টেস্ট খেলার সুযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে পুরুষদের থেকে অনেকটা পিছিয়ে এদেশের মহিলা দল। সেই বৈষম্যের অবসান না হওয়া পর্যন্ত মিলবে নাম সম্পূর্ণ আকাশ। বেঙ্গালুরু থেকে ফোনে শান্তা বলছিলেন, “এদেশে মহিলা ক্রিকেট এবং মহিলা ক্রিকেটের উন্নতিতে অনেক কাজ হয়েছে। তবে এখনও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে এখনও তফাত অনেকটা। বোর্ড জাতীয় দলে পুরুষ ও মহিলাদের ম্যাচ ফি সমান করেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় চুক্তিতে এখনও বৈষম্য রয়েছে। পুরুষদের সর্বোচ্চ বার্ষিক বেতন ৭ কোটি, মহিলাদের মাত্র ৫০ লক্ষ। সেটা সমান হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার থেকেও বড় বিষয়, ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচ ফি। মেয়েরা যেদিন রনজি ট্রফি বা পুরুষদের অন্য প্রতিযোগিতায় সমান অর্থ পাবে, সেদিন মনে করব বৃত্তটা সম্পূর্ণ হয়েছে।”
আর টেস্ট? গত পঞ্চাশ বছরে জাতীয় মহিলা দল খেলেছে মাত্র ৪১ টেস্ট। শেষ টেস্ট ২০২৪-এর জুনে। শান্তা চাইছেন, পুরুষ দলের সমান টেস্ট খেলার সুযোগ দেওয়া হোক মহিলাদেরও। “আমি মনে করি ভারতের মহিলা দলকে আরও টেস্ট খেলার সুযোগ দেওয়া উচিত। পুরুষ দলের সমান টেস্ট খেলুক মেয়েরাও। সেটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত”, বলছিলেন তিনি। একইসঙ্গে শান্তা মনে করিয়ে দিলেন বাস্তবচিত্রটাও, “কয়েক বছর আগে আমি বোর্ডের অ্যাপেক্স কাউন্সিলে ছিলাম। সেই সময় বোর্ডের তরফে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ও ইসিবি’র সঙ্গে মহিলা ক্রিকেট নিয়ে একটা মউ স্বাক্ষর করে। তাতে বলা হয়েছিল, ভারতের সঙ্গে এই দুই দেশের প্রতিটি সিরিজে একটা টেস্ট ম্যাচ বাধ্যতামূলকভাবে থাকবে। কিন্তু সেই প্রস্তাব সরাসরি বাতিল করে দিয়েছিল নিউজিল্যান্ডের মতো দেশ। এই তো অবস্থা!”
তবে বিশ্বজয়ীর তকমা পরিস্থিতি বদলে সাহায্য করবে বলেই মনে করছেন ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম মহিলা অধিনায়ক। “সত্যি বলতে, এদেশের মহিলা ক্রিকেটকে সেরা উপহার দিল এই দলটা। এই জয়ের পর দেশে মহিলা ক্রিকেটের প্রচার এবং প্রসার দু’টোই বাড়বে বলে আমি নিশ্চিত। মেয়েরা খেলার মাঠে আসবে। এখন যদি দশ হাজার মহিলা ক্রিকেটার থাকে, পরের তিন বছরে সংখ্যাটা পাঁচগুণ বাড়বে। এই বিশ্বকাপ ভারতে মহিলা ক্রিকেটের উন্নতিতে জ্বালানির কাজ করবে”, বিশ্বাস শান্তার।
বিশ্বকাপ জয়ের পরই শান্তা বার্তা দিয়েছেন, হরমনপ্রীতের উচিত অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেওয়া। তাঁর বিশ্লেষণ, “হরমনপ্রীত জাতীয় দলের সম্পদ। দুর্দান্ত ব্যাটার। ফিল্ডিংয়ে হয়তো সর্বকালের সেরা। কিন্তু সবটাই চাপা পড়ছে অধিনায়কত্বের ভারে। সেই ব্যাটিং, সেই ফিল্ডিং হারিয়ে যাচ্ছে। আমি বলব, ও সাধারণ সদস্য হিসাবে আরও তিন-চার বছর খেলতে পারবে। জাতীয় দল এবং হরমনপ্রীতের নিজের জন্য এই পদক্ষেপ করা জরুরি।” পরবর্তী অধিনায়ক হিসাবে মান্ধানকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত বলেও মত শান্তার।
