হতাশার রাজত্ব! ইউনুসের আমলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন

হতাশার রাজত্ব! ইউনুসের আমলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


ইউনূসের রাজত্বকালে প্রায় ৩ হাজার সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের ৩০টি জেলায় ঘটেছে ৭১টি হিংসার ঘটনা। বাংলাদেশের ৮ শতাংশ বা ১.৩ কোটি হিন্দু, তাছাড়াও খ্রিস্টধর্মী, বৌদ্ধ, আহমদি এবং অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায় আশঙ্কিত! ভবিষ্যৎ মৃত্যুগন্ধী জেনেও বড় মায়ার, মমতার ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকা সংখ্যালঘুদের কাহিনিটা তাই বড়ই হতাশার! লিখছেন চিরঞ্জীব রায়

প্রথমে তাকে পিটিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করা হল। তাতেও রোষ মেটেনি। তার রক্তাক্ত শরীর গাছের ডালে টাঙিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহর ভালুকায় দীপুচন্দ্র দাস নামের ওই যুবকের ‘অপরাধ’ ছিল, সংখ্যালঘু হয়েও সে বাংলাদেশের বাসিন্দা! সেই নৃশংস খুনের স্মৃতি যখন দগদগে, বছরের শেষ রাতে ফের শরিয়তপুরে খোকনচন্দ্র দাসকে প্রথমে কুপিয়ে, তারপরে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হল। এর মধ্যে ২৯ ডিসেম্বর পিরোজপুরে বেশ কয়েকটি সংখ্যালঘু পরিবারকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে সব দরজা-জানালা আটকে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়– অভিযোগ।

এগুলি হঠাৎ ঘটে যাওয়া অযাচিত ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পদচ্যুতি, মুখ্য উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার পরিচালনা, তার জেরে জামাত সমেত মৌলবাদীদের ছড়ি ঘোরানোর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ৮ শতাংশ বা ১.৩ কোটি হিন্দু, তাছাড়াও খ্রিস্টধর্মী, বৌদ্ধ, আহমদি এবং অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায় যে কোনও দিন দীপুচন্দ্র দাসের পরিণতির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

‘ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী ইউনূসের রাজত্বকালে প্রায় ৩ হাজার সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে খুন, যৌন নির্যাতন, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, মন্দির ভেঙে দেওয়া থেকে অপহরণ সবই আছে।

‘হিউম্যান রাইট্‌স কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ’-এর রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে– দেশের ৩০টি জেলায় গত জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৭১টি হিংসার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় সর্বক্ষেত্রে হিন্দুরাই অত্যাচারের শিকার হয়েছে। তার আরও প্রত্যক্ষ কারণ, তাদের শেখ হাসিনা-পন্থী এবং জামাত-বিরোধী বলে ধরে নেওয়াটাই রেওয়াজ। সরকার পরিস্থিতি সংশোধনে ব্যবস্থা নিয়েছে নামমাত্র। কারণ, ইউনূস সাহেবের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দেশত্যাগী শেখ হাসিনা। তাছাড়া, জামাত-কে অগ্রাহ্য করা তঁার পক্ষে সম্ভব নয়।

আসলে মৌলবাদের রক্তবীজটা বাংলার ‘সোনার’ মাটিতে পোঁতা হয়ে গিয়েছিল বিস্তর আগে, যখন ১৯৪৬ সালে মুসলিমদের জন্য পৃথক ভূমি চেয়ে মুসলিম লিগের নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন ঠিক এই ভাষায় দাঙ্গার বারুদে অগ্নিসংযোগ করেন– ‘আমাদের বিরোধিতা ভারতের সঙ্গে নয়, হিন্দুদের সঙ্গে।’ ইতিহাস বলছে, সেই দাঙ্গায় অন্তত ১৫ লক্ষ মানুষ খুন হয়। এই ব্যাপক গণহত্যায় খাজা সাহেবের ঘোষণার ‘অবদান’ অবশ্যই ছিল।

বর্বরতা– নিজেরই সমস্ত অতীত রেকর্ড অবশ্য ভেঙে চুরমার করে দিল ’৭১-এর দাঙ্গায়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী রাজাকাররা পাক-সেনার দোসর হল। এবং নিজেদের ‘সাচ্চা’ মুসলমান প্রমাণের জিগিরে শুরু হওয়া বীভৎস দাঙ্গায় ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাল। সোনার বাংলা থেকে ছিন্নমূল হল কয়েক কোটি হতভাগ্য।

বাংলাদেশের প্রায় সব রাষ্ট্রনেতাই গদি আগলানোর লিপ্সায় সাম্প্রদায়িকতার যে-কার্ড খেলেছেন, সে-দেশের সংবিধান কিন্তু আদৌ সেই অমানবিকতার পক্ষে রায় দেয় না। আর-পঁাচটা আধুনিক, সংস্কৃত দেশেরই মতো বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি– জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং হঁ‌্যা, শুনতে অবাক লাগলেও, ধর্মনিরপেক্ষতা! অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ আইনপ্রণেতার মূল অভীষ্ট ছিল, পদ্মা-মেঘনার দেশে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা, যেখানে জাতপাত, সম্প্রদায় ও ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য আইনের শাসন, ন্যায়, সমানাধিকার এবং মানবাধিকার সুনিশ্চিত হবে।

ধারা ২৭(৩), ধারা ৩৬ এবং বিশেষ করে ২-এ ধারায় স্পষ্ট করে দেওয়া হল, ‘এই সমাজতন্ত্রে শান্তি ও সংহতির সঙ্গে সকল ধর্মচর্চা করা যাবে।’ তাহলে ‘চাপাতি দিয়ে খুন’ করার প্রসঙ্গটা এল কোথা থেকে? ওটার উৎপত্তি ঘটালেন মহম্মদ এরশাদ। জনগণের রায়ে নয়, সেনা অভ্যুত্থানে দেশ দখল করা বাংলাদেশের কবি-রাষ্ট্রপতি ১৯৮৮ সালের জুনে সংবিধান সংশোধন করে জনগণের জীবনযাপন থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শর্তটি ছেঁটে ফেললেন। সোনার বাংলা আর সকলের কাছে সোনার রইল না, সরকারিভাবে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ ঘোষিত হল। এবং অপ্রত্যক্ষভাবে মৌলবাদী জঙ্গিদের সন্ত্রাসও সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে গেল। গল্পটা তাহলে দঁাড়াল কোথায় গিয়ে? প্রাণ সংশয়ে শঙ্কিত সংখ্যালঘুরা ’৪৬-এর পর, ’৭১-এর পর আবারও নতুন করে সাত পুরুষের সাধের, স্বপ্নের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হল। হতেই থাকল।

ভূ-রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক কারণে বাস্তুহারা হতভাগ্যদের বেঁচে থাকার গন্তব্য একটাই। অসাম্প্রদায়িক ভারত! কিন্তু, বিনা প্রশ্নে, সুস্থভাবে উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়াও অতটা সরল নয়। অভিবাসনের এমন কোনও চুক্তি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে নেই। আর অনুপ্রবেশ নিয়ে বিস্তর সমস্যা ভারতকে সেই স্বাধীনতালাভের জন্মকাল থেকেই পোহাতে হচ্ছে। দেশের গণতান্ত্রিক চরিত্র, আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সে বাবদে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে।

এখন নয়, প্রায় সিকি শতাব্দী আগে ২০০২ সালের ৪ জানুয়ারি, কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্ক সম্মেলনে ব্যাপক অনুপ্রবেশ সমস্যার জেরেই বাংলাদেশকে সে-দেশে মৌলবাদী অত্যাচারে লাগাম পরানোর ব্যবস্থা নিতে বলেছিল ভারত। অনুপ্রবেশের নথি থাকে না। ফলে এর বেশি বলা বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে নাক গলানো ভারতের পক্ষে কূটনীতিগত দিক দিয়ে সম্ভবও নয়।

ভবিষ্যৎ মৃত্যুগন্ধী জেনেও বড় মায়ার, মমতার ভিটেমাটি অঁাকড়ে থাকা সংখ্যালঘুদের কাহিনিটা তাই বড়ই হতাশার। তবে ঘনঘোর মেঘেও কখনও কখনও রুপোলি রেখা থাকে। বা বলা যায়, ছিল। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরজিতে সাড়া দিয়ে ২০১৬-র জুনে বাংলাদেশ মুফতি ও আলেম-ওলামা সংগঠন এক নির্দেশনামা জারি করে। মৌলানা ফরিদউদ্দিনের ঘোষিত এবং লক্ষাধিক মুফতি মৌলভির স্বাক্ষরিত ৬২ পাতার সেই অতি-ব্যতিক্রমী ফতোয়ায় স্পষ্ট বলা হয়, ইসলামের নামে সন্ত্রাস হারাম, অর্থাৎ ধর্মবিরোধী। ‘ইসলামের জেহাদ’ আর ‘মৌলবাদী জঙ্গিদের সন্ত্রাস’ সমার্থক নয়, সমর্থনযোগ্যও নয়। স্বর্গে যাওয়ার বাসনায় যারা জেহাদের নামে মানবিকতাকে খুন করছে, তারা আসলে জাহান্নামের পথই প্রশস্ত করছে। বাংলাদেশ সংখ্যালঘু ভাইদেরও বাসস্থান। সুতরাং অবিলম্বে সন্ত্রাস বন্ধ হোক।

সেই মৌলানাও নেই। সেই হাসিনাও নখদন্তহীন। তবে ভারত যথাসম্ভব সজাগ। বিদেশ সচিব সমেত বিভিন্ন কূটনৈতিক স্তরে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে। ভারত সেখানে বাংলাদেশবাসী ‘হিন্দু’ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, স্বাভাবিক পরিস্থিতির দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রক দীপু দাস-সহ প্রত্যেকটি হিংসার ঘটনার নিন্দা করেছে। বিহিত চেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমেত বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। মার্কিন কংগ্রেস কোনও রাখঢাক না করেই জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অক্ষমতাই দায়ী।

বাংলাদেশ সরকারের দাবি, চলতি হিংসা মোটেই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নয়, এটি বিচ্ছিন্ন ও সমাজবিরোধী ঘটনা। তা সত্ত্বেও সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে। দীপু দাসের মৃত্যুর জেরেও ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় ও সীমান্তে বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ, সেনা ও পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তঁার ক্যাবিনেটের দাবি, ‘এই নয়া বাংলাদেশে হিংসার কোনও জায়গা নেই।’

কিন্তু মুশকিল হল, ইউনূস-রাজের এমন দাবির জেরে গত প্রায় দেড় বছরের সংখ্যালঘু নির্যাতনের উপর পর্দা পড়ছে না। দীপু দাস থেকে খোকন দাস– দৈনন্দিন হিংসার ঘটনা পরিস্থিতির উন্নতির দিকেও ইঙ্গিত করছে না। আসলে, ভারত বা বাকি বিশ্ব নয়, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু আকাশের মেঘ কীভাবে সরবে, পর্যাপ্ত সদিচ্ছা দেখিয়ে সেটা বাংলাদেশকেই ঠিক করতে হবে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
chiranjibray67@gmail.com



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *