‘হপনে যদি পোলাও রাঁধেন কত্তা, বেশি কইরা ঘি ঢালেন।’ এ হল ঢাকার কুট্টিদের মশকরা। যদি কল্পনায় পোলাও রাঁধেন, তবে বেশি করে ঘি দিতে বাধা কী! ভোট এলে এই বাংলায় নতুন চল এটাই। আগে বাম-গণতান্ত্রিক সরকার নয়তো জাতীয়তাবাদী সরকার গড়ার ডাক দেওয়া হত। সংখ্যার লড়াই ছিল না। সে ছিল একরকম।
এখন তাসের জুয়ার মতো ডাক দেওয়া হয়। কেউ আগেরবারের থেকে একটা হলেও বেশি পাওয়ার ডাক দেয় তো কেউ ২০০-২২০’র কমে যায় না। কেউবা দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে নবান্ন দখলের হিসেব শোনায়। মানে ১৯৬টা। অন্যদিকে, ঘাসফুলের এক কথা, পঞ্চাশ পেরোবে না পদ্মফুল। দলের তরুণ তুর্কি আবার প্রতি কেন্দ্রে কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজারের মার্জিন বেঁধে দিয়েছেন।
নেতা বুঝে ডাকের ওজন বাড়ে। বিজেপিতে চাণক্য বলে পরিচিত অমিত শা আবার এই ডাক দেওয়ায় বেশ নাম বা দুর্নাম কুড়িয়েছেন। কখনও ‘আব কি বার চারশো পার’ তো কখনও ‘দোশো পার।’ এবার ভোটের আগে ঝিমিয়ে পড়া ‘কারিয়াকর্তা’দের গা গরম করতে এখনই বলে গিয়েছেন, ‘দিল পে লিখ লো, ইসবার হামারি সরকার।’ সেটুকুই নয়, শ্যামাপ্রসাদের এই রাজ্যে বিজেপি কত পাবে তাও জানিয়ে গিয়েছেন। দুই-তৃতীয়াংশ তো বটেই, দুশোর কম নয়।
এখানেই শেষ নয়, কলকাতা ও আশপাশের ২৮টা সিটের মধ্যে ২২টা জিততে হবে বলে টার্গেট ঠিক করে দিয়ে এযাত্রায় কলকাতা ছেড়েছেন তিনি। সাংবাদিকদের সহজ ব্যাখ্যাও দিয়ে গিয়েছেন। সেটা হল, ২০১৯ সালে লোকসভার ভোটে বিজেপি ৪১ পার্সেন্ট ভোট পেয়ে ১৮টা সিট জিতেছিল। ২০২১ সালে বিধানসভার ভোটে ৩৮ পার্সেন্ট পেয়ে জিতেছিল ৭৭টা সিট। যে পার্টি ২০১৬ সালের ভোটে ৩টে সিট জিতেছিল, পাঁচ বছরের মধ্যে তারা পেয়েছে ৭৭। এইসব হিসেব নিয়ে আগে বিস্তর কাটাছেঁড়া হয়েছে, পরেও হবে।
তবে কতগুলো শুকনো অঙ্কে যে রাজনীতি আটকে থাকে না, সেকথা কে না জানে! অমিতবাবু না বললেও সব্বাই জানে, গত পাঁচ বছরে কী কী হয়েছে। কত এমএলএ ওপাশ থেকে জোড়াফুলে ভিড়ে গিয়েছেন, সে হিসেব কোথায় যাবে! পাঁচ বছরে যে ক’টা উপনির্বাচন হয়েছে, তার একটাতেও জিততে পারেনি পদ্ম শিবির। বিরোধী দলনেতার পরিষদীয় দল কমতে কমতে এখন ষাটের ঘরে।
গতবার বিধানসভার ভোটে তৃণমূল পেয়েছিল ২১৩টা সিট। এযাবৎ সেটা তাদের সর্বোচ্চ স্কোর। তখন ভোট ছিল ৪৭.৯ পার্সেন্ট। তার আগে ২০১৬ সালে জিতেছিল ২১১টা সিটে। ভোটের শেয়ার ছিল ৪৪.৯ পার্সেন্ট। গত লোকসভা ভোটে বিজেপির ভোট ছিল ৩৯.১ পার্সেন্ট, তৃণমূলের ৪৬.২ পার্সেন্ট। তারও পাঁচ বছর আগে ২০১৯ সালের লোকসভায় বলতে গেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল দিলীপ ঘোষের বিজেপি। ১৬টা সিট বাড়িয়ে ৪২-এ ১৮ জন এমপি। তৃণমূল খুইয়েছিল ১২টা।
বিজেপি ৪০.৬৪ পার্সেন্ট আর তৃণমূল ৪৩। ব্যাস, ওইখানেই আটকে গেল বিজেপি। আর এগোল না। ঘোর করোনাকালে আট দফায় ভোটের সময়ও সভায় সভায় দুই গুজরাটি নেতা ‘আব কি বার, দোশো পার’ বলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। সবাই মানবেন, রাজনীতির অঙ্ক সবসময় ঠান্ডা পাটিগণিতে হয় না। কষতে হয় আরও নানারকম হিসেবনিকেশ, মাপতে হয় হাওয়ার গতি। ফলে নিছক কিছু সংখ্যা দিয়ে ভোট বুঝতে গেলে হাতে বেশিরভাগ সময় পেন্সিলও থাকে না।
এবারের ভোটে বিজেপির হাতে ইস্যু কি কম? চাকরিতে দুর্নীতি থেকে খুনোখুনি, পঞ্চায়েতের পুকুরচুরি, মন্ত্রীদের জেল… কী আর বাকি! কিন্তু সেসব নিয়ে বাজার গরম করবে কে? ভোটের মুখে এখন এসআইআর নিয়ে বরং বিজেপির মহামান্যরা নাকানিচোবানি খাচ্ছেন। যার পুরোটাই বরং বিজেপির বুমেরাং হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এক কোটি, দেড় কোটি ঘুসপেটিয়া, রোহিঙ্গা নিয়ে প্রচারটা এখন তাদের বিড়ম্বনা বাড়াচ্ছে।
তাই এখন আর ওসব নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য শোনা যাচ্ছে না আগুনখোর গেরুয়া নেতাদের। উলটে নাগরিকদের হয়রানি থেকে ভোটকর্মীদের দুর্গতি আর মৃৃত্যু নিয়ে আসর জমিয়ে দিয়েছে তৃণমূল। অন্যদিকে, বঙ্গ বিজেপির ঘরের কোন্দল তীব্র। শুভেন্দু একদিকে, শমীক আরেকদিকে। সুকান্ত আবার নিজের তালে। এর মধ্যে দিলীপ ঘোষকে ফিরিয়ে এনে দাঁড় করানো হল শুভেন্দুর মুখোমুখি।
কাঁথির হেভিওয়েট আর মেদিনীপুরের দাবাং নেতার মধ্যে পপুলারিটির লড়াই এখন বেশ জমজমাট। তৃণমূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগে এদিকেই তাঁদের নজর দিতে হচ্ছে বেশি। এমনিতেই আদি, নব্য, আরএসএসপন্থী ইত্যাদি নানা ভাগ রয়েছে বিজেপিতে। ফলে শাহি টোটকায় কাজ কতটা হবে, তা নিয়ে চর্চা রয়েছে দলের ভিতরেও।
তৃণমূলে অবশ্য নেত্রীই সবকিছু। তিনিই শুরু, তিনিই শেষ। তিনিই জেতান, তিনিই ভাসান। মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে তাঁর ভাইপোর ঝামেলা নিয়ে নানা খোশগল্প শোনা গেলেও তা ধোপে টেকে না। বরং ক্রমে অভিষেকের চেয়ার মজবুত হচ্ছে দলে। এবারের ভোটে সামনের সারিতে তিনিই। প্রচারের আলোর অনেকটা পিসির সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও এসআইআর নিয়ে তর্কাতর্কিতে বাকি সব চলে গিয়েছে পিছনে। হাতে রইল হিন্দুত্ব নিয়ে বিজেপির খোলাখুলি গলাবাজি। ওতে কতটা চিঁড়ে ভিজবে, পরপর ভোটে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। এখন ‘রাষ্ট্রবাদী মুসলিম’দের ভোটও চাইতে হচ্ছে আগমার্কা সনাতনী নেতাকে। এর মধ্যে জগন্নাথ মন্দির, দুর্গা অঙ্গন, মহাকাল মন্দির নিয়ে বাজারে নেমে মুসলিম তোষণের সাবেক অস্ত্রটাকে অনেকটা ভোঁতা করে দিয়েছে শাসকদল।
আরএসএস-এর শতবর্ষে বঙ্গবিজয়ের স্বপ্নপূরণ নাগালের মধ্যে বলার সময় কিন্তু আসেনি।
