স্বপ্নাতুর শৈশব ও ফিকে ভবিষ্যতের খতিয়ান

স্বপ্নাতুর শৈশব ও ফিকে ভবিষ্যতের খতিয়ান

ব্লগ/BLOG
Spread the love


রাহুল দাস

‘মাধ্যমিক পরীক্ষা’- আমাদের ছাত্রজীবনে এই শব্দবন্ধটি এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চাপের নাম। ছাত্রছাত্রীদের মনের গভীরে গেঁথে দেওয়া হয় যে, এই একটি পরীক্ষাই জীবনের শেষ কথা। অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন এবং শিক্ষকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পরীক্ষার্থীর মনে কৌতূহলের চেয়ে ভীতিই বেশি তৈরি করে। নিজেকে তখন কেবল একজন শিক্ষার্থী নয়, বরং এক অসম প্রতিযোগিতার প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে হতে থাকে। জীবনের প্রথম বড় এই বাধা পার হতে গিয়ে অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, অথচ জীবনের বৃহত্তর ক্যানভাসে এই পরীক্ষার ভূমিকা কতটুকু তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।

জীবন যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা

বাস্তবতা হল, মাধ্যমিক শেষ করার এক দশক পর যখন মানুষ কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তখন দেখা যায় ওই পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর খুব কম ক্ষেত্রেই ভাগ্য নির্ধারণ করছে। জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে বা কোনও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় মানসিক পরিপক্কতা এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দক্ষতা। জীবন আসলে বারবার সুযোগ দেয়, ভুল সংশোধনের পথ দেখায়। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থা শৈশবেই এমন এক ভীতি তৈরি করে রাখে, যা পরবর্তী জীবনে কেবল ব্যর্থতার গ্লানি হিসেবেই তাড়া করে বেড়ায়। অথচ অভিজ্ঞতাই মানুষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

রাজ্যের কর্মসংস্থান ও অনিশ্চয়তা

বর্তমান সময়ে মাধ্যমিকের গুরুত্ব কেবল নম্বরে আটকে নেই, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজ্যের সামগ্রিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতি। বর্তমানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার ফল বেরোতে তিন বছর পার হয়ে যাচ্ছে। টেট বা এসএসসি উত্তীর্ণ হয়েও যোগ্য প্রার্থীরা পথে পথে ঘুরছেন। এই প্রশাসনিক দীর্ঘসূিত্রতা ও দুর্নীতির ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। মেধাবী ছাত্ররা আজ সিভিক ভলান্টিয়ার বা যৎসামান্য বেতনের বেসরকারি কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। কঠোর পরিশ্রমের পর ‘অযোগ্য’ তকমা পাওয়ার ভয় তরুণ প্রজন্মকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

উচ্চশিক্ষায় অনীহা ও মানসিক স্বাস্থ্য

এই অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উচ্চশিক্ষার আঙিনায়। যে সব বিষয়ে অনার্স পড়ার জন্য কয়েক বছর আগেও প্রবল ভিড় দেখা যেত, আজ সেইসব কলেজের আসন খালি পড়ে থাকছে। উচ্চশিক্ষার প্রতি এই অনীহা আসলে এক গভীর হতাশার প্রতিফলন। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকায় যুবসমাজ লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও অনিশ্চয়তা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি করছে। আয়ের উৎস খুঁজতে গিয়ে তারা অনেক সময় বিপথে পরিচালিত হচ্ছে, যা সমাজের জন্য এক অশনিসংকেত।

উত্তরণের পথ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব

পরিশেষে, মাধ্যমিকের গুরুত্ব আজ কেবল পরীক্ষার হলের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশাসনিক জটিলতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব মেধাবী তরুণদের পরিশ্রমকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়বে এবং উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো ভেঙে পড়বে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাধ্যমিক যেন কেবল হতাশার প্রতীক না হয়ে সম্ভাবনার প্রথম ধাপ হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সুস্থ পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাই পারে যুবসমাজের মনে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে।

(লেখক অক্ষরকর্মী তুফানগঞ্জের বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *