মহিলাদের দেখা যায় সোনার দোকানের কাউন্টারের, ক্রেতা আর বিক্রেতা হিসেবে। সেই চেনা ছক ভেঙেছেন আলিপুরদুয়ারের দুই বোন, শান্তি আর পুনম। তাঁরা নিজের হাতে গয়না গড়েনও।
প্রণব সূত্রধর, আলিপুরদুয়ার: শনিবার ধনতেরাস। আর কালীপুজোর একদিন আগে এই ত্রয়োদশীতে গয়নাগাঁটি কেনা এখন বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক ট্রেন্ডিং। তবে কেবল ধনতেরাস কেন, বিয়েবাড়ি হোক বা যে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান, গয়না পরার প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ থাকেই মহিলাদের। কিন্তু গয়নার দোকানে মহিলা স্বর্ণকার দেখেছেন কয়জন? ব্যতিক্রম পুনম দাস ও শান্তিকুমারী দাস। চাপরেরপার গ্রাম পঞ্চায়েতের ধারেয়াহাটের বাসিন্দা এই দুই বোনের গয়নার দোকান রয়েছে। তাঁরা নিজেরাই গয়না গড়েন, নিজেরাই বিক্রি করেন।
একশো মিটারের মধ্যে দুই বোনের আলাদা আলাদা দোকান। সেই দোকান অবশ্য খুব বড় অথবা নামী ব্র্যান্ডের দোকানের মতো ঝাঁ চকচকে নয়। দু’বোনের দোকানেই তো কোনও কর্মচারীও নেই। গ্রামীণ এলাকায় লোকজনের হাতে তেমন টাকা থাকে না। পার্বণে বা কোনও সামাজিক উপলক্ষ্যে টুকটাক বিক্রিবাট্টা হয়। বলছিলেন তাঁরা। সোনার গয়নার তুলনায় তাই অপেক্ষাকৃত কম দামের রুপোর গয়নার অর্ডারই আসে বেশি। সংসার সামলে অর্ডার অনুযায়ী অলংকার তৈরি করা থেকে শুরু করে দোকানের যাবতীয় কাজ নিজেরাই করেন।
পুনম ও শান্তির বাবাও ছিলেন স্বর্ণকার। তাঁর কাছেই এই কাজে হাতেখড়ি দুজনের। স্কুলজীবনেই বাবার কাছে যে কাজ শিখেছিলেন, আজ সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের উপার্জনের চাবিকাঠি। তাঁদের দাদা ও ভাইরাও এই কাজ জানেন ঠিকই, তবে বর্তমানে তাঁরা আর গয়না গড়ার কাজ করেন না। বাবার পেশা ধরে রেখেছেন দুই বোনই।
শুধু দুই বোন ছাড়াও মা, দাদা, ভাই সকলেই ওই কাজ জানেন। বর্তমানে দাদা, ভাই নিজেদের বিকল্প কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তবে দুই বোন বাবার জীবিকাকে নিজেদের পেশা করে তুলেছেন। বারো বছর বয়সে পুনম বাবার কাছে কাজ শেখা শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে গয়না তৈরির কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন। বিয়ের আগেই নিজের দোকান তৈরি করেন তিনি। সন্তান দেখভালের জন্য মাঝে বাড়িতেই দোকান দিয়েছিলেন। তবে এখন অবশ্য ধারেয়াহাটের প্রধান সড়কের পাশে গেলেই নজরে পড়বে বছর পঁয়ত্রিশের পুনমের গয়না তৈরির দৃশ্য। একহাতে অলংকার তৈরির পাশাপাশি আবার অর্ডার সামলাচ্ছেন। পুনম বলেন, ‘বেশি পড়াশোনা করতে পারিনি। ভালোবেসে বাবার পেশাকে ধরে রেখেছি। কাজে কোনও নারী-পুরুষ ভেদাভেদ রয়েছে বলে মনে করি না।’
এদিকে, দশ বছর বযস থেকে শান্তির কাজ শেখা শুরু। বাবাকে কাজে সহযোগিতা করতে করতে স্বর্ণশিল্পী হয়ে উঠেছেন তিনি। প্রায় কুড়ি বছর ধরে বাবার দোকান সামলাচ্ছেন। একসময় মাটির মেঝেতে বসেই কাজ করতেন। এখন অবশ্য দোকানের জৌলুস কিছুটা বেড়েছে। অলংকার সাজিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়িতে ছেলেমেয়ে ও সংসার সামলে ব্যবসাও সামলানোটা যেন নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে বছর সাঁইত্রিশের শান্তির। পুনমের মতো তিনিও কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ ভেদাভেদের কথা না মানলেও নারী-স্বর্ণকার হওয়ার সমস্যাটা বোঝেন। শান্তি বলছিলেন, ‘মেয়ে দেখে অনেকে সোনার কাজের অর্ডার দেন না। তাই রুপোর অলংকার বেশি তৈরি করি। সারা বছর অর্ডার পাই।’ তবে তাঁদের দোকান ছোট, মূলধনও কম। তার ওপর যেভাবে চলতি বছরে সোনা ও রুপোর দাম আকাশ ছুঁয়েছে, তাতে এবার ধনতেরাসে তেমন অর্ডার পাওয়া যায়নি, একযোগে জানালেন দুই বোন।
