রূপায়ণ ভট্টাচার্য
সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে আইনজীবীদের ভিড় থিকথিক করছিল শুধু তাঁকে দেখতে। সুপ্রিম কোর্টে তাঁর সওয়ালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনটা? কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবেন, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে।
বারবার পথে নেমে আন্দোলন করাই যে কোনও রাজনৈতিক পার্টির সেরা অস্ত্র, তা আর একবার প্রমাণ করে দিলেন মমতা। বাংলার মানুষের পাশে আছি, এই ভাবনাটা মানুষের মনে গেঁথে দিতে পারলেন আবার। তাঁর আমলের দুর্নীতি, দাদাগিরি একটা সিদ্ধান্তের জোরে পিছনে চলে গেল অনেকটা।
তবে মমতার নানা সওয়ালের মধ্যে একটি সওয়াল গোটা দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবারই মনে মনে এই প্রশ্ন জাগে বহুদিন ধরে। স্পষ্ট কোনও উত্তর মেলে না।
এসআইআর নিয়ে সব জায়গায় এত নাটক হলেও বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া অসমে এই জিনিসটা হল না কেন? মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বিজেপির চকোলেট বয় বলে!
বিজেপি মাঝে মাঝেই ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কথা বলে, শোনায় ডাবল ইঞ্জিনে কত লাভ। এখানেই কিন্তু ভয়ংকর সর্বনেশে কথা তারা বলে দিচ্ছে সরাসরি, লজ্জাহীন। যে রাজ্যে বিরোধী দল থাকবে, সেখানে আমরা ঢেলে উন্নয়ন করব না! চেপে দেব! এটা কী ধরনের ভদ্রতাবোধ! এ তো স্পষ্ট হুমকি! ব্ল্যাকমেল। কেন্দ্রের পক্ষে এটা কি মানায়?
কে একজন বলেছিলেন, অসমের রাজনীতিতে ‘বিদেশি খেদাও’ সমস্যা হল বিরিয়ানিতে জাফরানের মতো। বিজেপি সরকারের কাছে সুগন্ধী। ভোট এলেই সেই সুগন্ধী সব জায়গায় ছড়ানো হতে থাকে। বিদেশি খেদাও, বিদেশি খেদাও- এমনভাবে বলা হয় তখন, এটা যেন হাতের মোয়া। মারব এখানে, শরীর পড়বে বাংলাদেশে।
অথচ সেই রাজ্যেই ভোটার তালিকা ঝাড়াইবাছাইয়ের সময় যখন এসআইআর প্রয়োগের কথা হল, তখন কেন্দ্র-রাজ্যকে গলাগলি করে বলতে শোনা গেল- এখন এসব নয় বাবা, ভোটের পর দেখা যাবে।
নাও ঠ্যালা! এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! বিশ্বশর্মা বলছেন, আর মোদি-শা শুনবেন না, তা কী করে হয়!
যে হাসির যুক্তি শোনানো হচ্ছে, তা থেকে স্পষ্ট, মোদি জমানায় যা খুশিই হতে পারে। এক রাজ্যে এক নিয়ম, অন্য রাজ্যে অন্য নিয়ম। আমার এলাকায় এক নিয়ম, তোমার এলাকায় আর এক নিয়ম। সবই আমার পছন্দমতো। আমিই নিয়ম গড়ি, আমিই নিয়ম ভাঙি।
কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি হচ্ছে, অসমে এনআরসি চূড়ান্ত হয়নি বলে এসআইআর হওয়া মুশকিল। নাগরিকপঞ্জি চূড়ান্ত হয়নি বলে নিবিড় সংশোধন হবে না। ব্যাপারটা কত হাস্যকর ভাবুন। বিরোধীরা ভাঙা বাড়ির উদাহরণ দিচ্ছেন। বলছেন, বাড়ির ছাদ ভাঙা, জল পড়ছে। ওটা মেরামত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি একটা কারণে। ঘরের মালিক এখনও সিদ্ধান্ত নেননি, বৃষ্টির জল ধরার বালতিটা প্লাস্টিকের হবে, তা লোহার। তাই আসল বড় কাজটাই হয়নি।
হিমন্ত বিশ্বশর্মার বড় ঢাল হল, ২০১৯ সাল থেকে এনআরসি না হওয়া। এখন কিছু কড়া পদক্ষেপের কথা বললেই ভদ্রলোক ও তাঁর সঙ্গীরা ঢাল করে দেন ওটাকেই। এনআরসি না করাটাই তাঁর বড় অস্ত্র হয়ে গিয়েছে। অথচ হিমন্ত মুসলিমদের যেভাবে মিয়াঁ বলে কটাক্ষ করে যাচ্ছেন, যোগী আদিত্যরাজ বাদে পদ্মের কোনও মুখ্যমন্ত্রী তা করেন না। এসব বলতে তাঁর সামান্য বিবেক দংশন হয় না। কারণ তিনি দলবদলিয়া। বাংলার দলবদলিয়া পদ্ম নেতাদের মতো তাঁরও দায়, নিজেকে প্রবল হিন্দু প্রমাণ করা। চরম সাম্প্রদায়িক হিমন্ত হিন্দু তাসেই জয় আনতে চান। এবং তিনি ভোটযুদ্ধে অনেকটাই ফেভারিট।
শীত শেষে বসন্তের মুখে হিমন্ত এখন কথায় কথায় মিয়াঁ মুসলিমদের বিরুদ্ধে হুংকার দিচ্ছেন। অথচ এসআইআর না করার সময় এঁরাই তাঁর ঢাল। বলা হচ্ছে, এসআইআর করলে ৪-৫ লক্ষ মিয়াঁর নাম বাদ যেত। তাই ওই প্রক্রিয়া ২০২৬ সালের নির্বাচনের পরে হবে। ব্যাপারটা কী হল তা হলে! এটা অনেকটা নিমন্ত্রণ খাইয়ে দাইয়ে অতিথিদের বলে দেওয়া- আপনাদের তো নিমন্ত্রণ ছিল না ভাই।
আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? বাংলায় যখন এসআইআর-এর নামে নানা তল্লাশি হচ্ছে, অসমে চলছে সাদামাঠা এসআর।
নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপির হয়ে কাজ করতে ব্যস্ত। অসমের ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি একেবারে ছেঁদো। তাদের যুক্তি, সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে নাগরিকত্ব যাচাই চলছে, তাই পাশাপাশি এসআইআর চলছে না। দুর্জনের ছলের অভাব নেই। বিশ্বশর্মা আসলে স্থায়ী সমাধান চাইছেন না। বরং চ্যাঁচামেচি করে যাবেন, ভোটার তালিকা কত ভুলে ভরা। এ সব বললে লাভ বেশি। কেননা অধিকাংশ ভোটারই অশিক্ষিত, খতিয়ে দেখতে চান না।
প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বর্তমানে অসমে এসআইআর-এর পরিবর্তে ‘বিশেষ সংশোধন’ প্রক্রিয়া চালানো হবে, তার কারণটা কী। কমিশনের যুক্তি, অসমের নাগরিকত্ব আইন এবং আইনি প্রেক্ষাপট ভারতের অন্যান্য রাজ্যের থেকে আলাদা। তাই সেখানে একটি আলাদা কর্মসূচি দরকার। এটা কোনও যুক্তি হল? বিজেপি সরকারের বদলে এখানে কংগ্রেস সরকার থাকলেও কি এ কথা বলা হত? মোটেই না।
মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, রাজ্য সরকার নির্বাচন কমিশনের কাছে এসআইআর-এর জন্যই অনুরোধ করেছিল। তাঁর মতে, এসআইআর হলে ভোটার তালিকা থেকে অবৈধ বা সন্দেহভাজন নামগুলো বাদ দেওয়া সহজ হত। তবে কমিশনের নির্দেশে বর্তমানে সেখানে এসআর চলছে।
বিরোধীদের পালটা অভিযোগ কিন্তু ভয়ংকর। তাঁরা বলছেন, সরকার আইনি পথে না গিয়ে দলীয় কর্মীদের ব্যবহার করে গোপনে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নাম বাদ দিয়ে দিচ্ছে। কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ ভালো করে জানেন হিমন্তকে। একই দলে ছিলেন একদা। তিনি বলছেন, ধর্মীয় মেরুকরণ জিইয়ে রাখতেই বিজেপি এই ইস্যু জিইয়ে রেখেছে। দলীয় কর্মীদের দিয়ে অনেকের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দলীয় কর্মীদের এভাবে কাজে লাগানো যায় কীভাবে, প্রশ্নটা তুলেছেন গগৈ। প্রশ্নই তুলেছেন। কিন্তু সারা দেশে হইচই ফেলে দেননি।
হিমন্ত বিশ্বশর্মার একটাই সুবিধে। সেটা বিশাল সুবিধে। এই সুবিধে বিহারে নীতীশ কুমারেরও ছিল।
তাঁদের দুজনের কারও রাজ্যে কোনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেই। যিনি মাঝে মাঝেই শাসক নেত্রী থেকে বিরোধী নেত্রী হয়ে উঠতে পারেন। এবং যখন তখন এখনও রাস্তায় নেমে আন্দোলনের ডাক দিয়ে দিতে পারেন পনেরো বছর পরেও। রাস্তা ভুলো না ভাই, হাঁটো হাঁটো।
