সহজে হজম ভেজালের সঙ্গে অন্যায়, অবিচারও 

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


গৌতম সরকার

মাংস পচে ফ্রিজে জমাট বেঁধে গিয়েছে। মাছ কতদিনের বাসি কে জানে! ঘি-তে থিকথিকে পোকা। পনিরে ছত্রাক। বাংলার বিভিন্ন শহরে গত কয়েকদিনে এই চিত্রটা উঠে আসছে প্রশাসনের অভিযানে। ভাবলেই গা ঘিনঘিন করে। অথচ আমাদের পাঁচ পাবলিকের হজমশক্তি ভাবুন! রেস্তোরাঁয় গিয়ে কিংবা ফুড ডেলিভারি সংস্থাকে দিয়ে বাড়িতে আনিয়ে সেসব খাবার আমরা চেটেপুটে খাচ্ছি। হজমও করে ফেলছি।

হজম যেন আমাদের মজ্জায়। বাসি, পচা যাই হোক, আমাদের কাবু করতে পারে না। রেস্তোরাঁর কিচেনে উঁকি মেরে প্রশাসনের কর্তাদের অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড়। মিষ্টির কারখানায়ও তাই। এমন নয় যে, এসব আমরা আগে দেখিনি। খেতে গিয়ে অনেক সময় কখনও রেস্তোরাঁ বা মিষ্টির দোকানে খাবার তৈরির জায়গাটা আমরা দেখে ফেলি। হয়তো নর্দমার ওপর রান্না করা মাংস কিংবা শৌচালয়ের ভিতর মিষ্টিভর্তি পাত্র দেখেছি।

দেখে নিজেরা বলাবলি করি, কী জঘন্য রে! তারপর অবশ্য গল্প করতে করতে খেয়েও ফেলি। কখনো-কখনো তারিফ করি- রান্নাটা বেড়ে হয়েছে মশাই। দোকানদার মশাইয়ের মুচকি হাসিতে তখন আড়াল হয়ে যায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্নার ব্যবস্থাপনা। আমরা সামান্য প্রতিবাদটুকু করি না। পরিবার বা বন্ধুবান্ধব সহ খেয়েদেয়ে বরং মোটা অঙ্কের বিল মিটিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ফিরে আসি। হজমশক্তি আমাদের প্রখর যে!

অথচ দেখুন, বাংলার অধিকাংশ শহরের পাড়ায় পাড়ায় আবর্জনার স্তূপ। নালা ওপচানো নোংরা। অল্প বৃষ্টিতে পথচলতি মানুষের পায়ে জড়িয়ে যায় জঞ্জাল। দূষণের বিপদ ঘাড়ের ওপর। প্রশাসন দৌড়ে বেড়াচ্ছে রেস্তোরাঁয়, হোটেলে, মিষ্টির দোকানে। সংবাদমাধ্যমে ছবি ছাপা হচ্ছে। আহা, কী সরকারি তৎপরতা! কিন্তু আবর্জনা সাফাইয়ে কারও দেখা নেই। অধিকাংশ পুরসভায় নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে গিয়েছে। থাকলেও পঙ্গু। অনেক পুরসভায় প্রশাসনের কেষ্টুবিষ্টুরা এখন প্রশাসক। যাঁরা শহরের রাস্তায় বেআইনি হোর্ডিং ভাঙতে ব্যস্ত।

কিন্তু অনেক বেলা পর্যন্ত, এমনকি সারাদিন পথে আবর্জনা পড়ে থেকে নরক হয়ে থাকলেও সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই প্রশাসকদের। আমরাও প্রতিবাদ করি না। বরং শাসকের ভাষ্য মেনে নিই- মাত্র তো নতুন সরকারের চার মাস। সময় তো পড়ে আছে। করবে নিশ্চয়ই। দিদিমা-ঠাকুরমাদের মুখে শোনা প্রবাদটা ভুলে যাই- যার হয় না আটে, তার হয় না আশিতে। আমরা অন্যায় দেখেও  বেমালুম হজম করে ফেলতে পারি।

তৃণমূল জমানায় আবাস পেতে কাটমানি দেওয়া বাধ্যতামূলক দেখেও নির্বিকার ছিলাম আমরা! অন্যায় হজমের ক্ষমতা কতটা হলে তা পারা যায় ভাবুন। বাড়ির পাশে অন্যের জমিটা কোন দলের নেতা বা দল-ঘনিষ্ঠ প্রোমোটার দখল করছেন দেখেও চুপ করে থাকতে পারি সে কারণেই। ভাবি, এই তো ভালো আছি বেশ। বেশি বিপ্লবী সাজলে যদি আমাকে ধরে মারে। আমার জমিটার দিকে হাত বাড়ায়। তাই জেনেও না জানার ভান করে থাকা।

এও একধরনের হজম। এই হজম ক্ষমতা দুর্নীতিকেও গিলে খায়। চাকরি দেওয়ার নামে ভীষণ অনিয়ম করেছিল তৃণমূল সরকার। কোটি কোটি টাকার পাহাড় জমেছিল প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বাড়িতে। টাকাটা কিন্তু দিয়েছিলাম আমরাই। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকরির ব্যবস্থা করতে ঘুষ দিতে আমরা দু’বার ভাবিনি। তাই প্রতিবাদ করার কলিজাও আমাদের নেই। অপরাধ হজম করতে শিখে ফেলেছি আমরা।

বাড়ি থেকে বেরোতে দেবেন না বলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুংকার শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। বরং এই মনোভাব সার্বিকভাবে গণতন্ত্র বিরোধী। যে মনোভাব ২০১১-তে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মমতা সিপিএমের প্রতি দেখিয়েছিলেন। মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে বলেছিলেন। এত বড় চরম অগণতান্ত্রিক আস্ফালনের প্রতিবাদ মানে কিন্তু তৃণমূলকে সমর্থন নয়। বরং গণতন্ত্র রক্ষার পদক্ষেপ। আমরা আমআদমি কিন্তু সেদিন যেমন মমতাকে, তেমন এখন শুভেন্দুকে বলিনি, আপনি ঠিক করছেন না।

গণতন্ত্র ধ্বংসের মনোভাব অন্যায় জেনেও চুপ আমরা। অতি সম্প্রতি বালুরঘাটে এসে মুখ্যমন্ত্রী জেলা পরিষদকে এড়িয়ে কাজ করার জন্য দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন। যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর বিরাট আঘাত। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বাদ দিয়ে প্রশাসন পরিচালনা তো আসলে স্বৈরতান্ত্রিক ঝোঁক। তৃণমূলের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুর বোর্ড ভেঙে প্রশাসক বসিয়ে দেওয়াও তাই।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বজোড়া বিখ্যাত উৎকর্ষ কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু বলে এসেছেন, হিসেব নেওয়ার শেষ পর্যায় এখন। হয় ওঁরা থাকবেন না হয় আমরা! গণতন্ত্রের বিপরীত ভাষ্য বলেও পার পেয়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। আমরা ভুলে যাই উৎকর্ষ কেন্দ্র মানে বহু মতের চর্চা। বিরোধী পরিসরকে বিস্তৃত করার সুযোগ। শতফুল বিকশিত হতে না দিয়ে শুধু পদ্মফুলের পুকুর বানানোর সেই চেষ্টায় বাংলাজুড়ে প্রতিবাদ নেই।

একুশ শতকে আমরা সবকিছু নির্বিবাদে মেনে নিতে শিখে গিয়েছি। তারুণ্যের স্বাভাবিক ধর্মে কেউ কেউ ব্যতিক্রমী হন না, তেমন নয়। কিন্তু হজমের সিস্টেমটা এত শক্তিশালী যে, তাঁদের গিলে নেওয়া হয়। এমন গিলে খাওয়ার জ্বলন্ত উদাহরণ কানহাইয়া কুমার। ককরোচ জনতা পার্টির পরিণতি হয়তো সেরকমই। যাঁদের গেলা সম্ভব হয় না, তাঁদের ‘বেয়াদপি’ ঠান্ডা করতে জেলের ঠান্ডা সেল প্রস্তুত। এমন উদাহরণও কম নয়।

সেসব বললে বা লিখলে আবার দেশদ্রোহী তকমা জুটবে নিমেষে। তবে হজম ক্ষমতা বাড়িয়ে সিস্টেমের দাসত্ব করে শেষপর্যন্ত সবসময় নিজেদের নিরাপদ রাখা যায় না। দাসখত একবার লিখে দিলে ফোঁস করার ইচ্ছেটাকেও হজম করে ফেলতে হয় যে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *