পরীক্ষা শেষে বই ছেঁড়ার হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে দায়বদ্ধতার পাঠ নিক আগামীর ছাত্রসমাজ।
রাহুল দাস
বর্তমান সময়ে মাধ্যমিক (Madhyamik Examination) বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার (Greater Secondary) শেষ দিনে পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে বই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি সামাজিক মাধ্যমে প্রায়শই চোখে পড়ে। কয়েক বছর ধরে এটি যেন এক অপ্রীতিকর রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, যা দেখে সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ও হতাশা ব্যক্ত করেন। নতুন প্রজন্মের এমন আচরণ নিয়ে সমালোচনার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। বই কেবল কাগজের সমষ্টি নয়, বরং তা জ্ঞানচর্চার পবিত্র মাধ্যম এবং এই মাধ্যমকে অবমাননা করা কোনওভাবেই কাম্য হতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, গভীর দায়িত্ববোধ এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রতি সংবেদনশীলতা।
পরীক্ষা শেষের উদযাপন অতীতেও ছিল, তবে তার ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মার্জিত। সেসময়ে পরীক্ষা শেষ হওয়ার আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হত বনভোজন, আত্মীয়র বাড়ি ভ্রমণ কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার মধ্য দিয়ে। তবে স্বীকার করতেই হয় যে, উচ্ছৃঙ্খলতার বীজ অতীতেও সুপ্ত ছিল না; শেষ পরীক্ষার দিনে অনেক সময় পরীক্ষাকেন্দ্রে বেঞ্চ ভাঙা বা আসবাবের ক্ষতি করার মতো বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটত। আধুনিক সময়ের সঙ্গে পার্থক্যের জায়গাটি হল প্রচারমাধ্যম। বর্তমান যুগে সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের ফলে এই জাতীয় নেতিবাচক ঘটনাগুলি দ্রুত জনসমক্ষে চলে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যে তা সর্বজনীন সমালোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রবণতার গভীরে প্রবেশ করলে বেশ কিছু আর্থসামাজিক কারণ পরিলক্ষিত হয়। একটা সময়ে পাঠ্যবইকে দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হত, যা উত্তরসূরি বা অনুজদের পাঠগ্রহণে সাহায্য করত। কিন্তু বর্তমানে প্রতি বছর পাঠক্রমের দ্রুত পরিবর্তন এবং নিত্যনতুন সংস্করণের ভিড়ে পুরোনো বইয়ের প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই কমে গিয়েছে। পাশাপাশি, আজকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অনেক অভিভাবকের কাছে শিক্ষা এখন কেবল জ্ঞানার্জনের পথ নয়, বরং সাফল্যের এক কঠোর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নিরন্তর সাফল্যের ইঁদুর দৌড় এবং ভালো ফলের অতিরিক্ত মানসিক চাপ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের অবদমিত আক্রোশ তৈরি করে। সম্ভবত সেই অসহনীয় চাপ থেকে সাময়িক মুক্তির লক্ষ্যেই তারা অবচেতনভাবে বই ছেঁড়ার মতো পথ বেছে নেয়।
তবে কেবল সমালোচনা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক পদক্ষেপ। যাদের বাড়িতে পুরোনো বই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, সেগুলি সুপরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে যেমন জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ হবে, তেমনি শিক্ষার আলো পৌঁছে যাবে প্রান্তিক স্তরে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সচেতন অভিভাবক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ যদি যৌথভাবে একটি বই সংগ্রহ ও বিতরণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন, তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই সংরক্ষণের একটি দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। এটি যেমন সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করবে, তেমনি অন্যের প্রয়োজনে নিজের সম্পদ উৎসর্গ করার মানসিকতাও গড়ে তুলবে। পরিশেষে বলা যায়, অভিভাবকদের উচিত সন্তানের ওপর অযৌক্তিক প্রত্যাশার বোঝা না চাপিয়ে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অধিক যত্নশীল হওয়া। পরীক্ষা যে জীবনের একমাত্র মাপকাঠি নয় বরং একটি অংশ মাত্র, এই বোধটি শৈশব থেকেই বপন করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠক্রমেও শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে আরও নিবিড় আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
(লেখক অক্ষরকর্মী। তুফানগঞ্জের বাসিন্দা।)
