শেখর সাহা
পরিকল্পনামাফিক চললে ১২ ফেব্রুয়ারি হতে চলেছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি কেবল কোনো রুটিনমাফিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং ২০২৪-এর গণআন্দোলন ও শেখ হাসিনার পতনের পরবর্তী এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের কর্পোরেট-আমলাতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্র যে সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তা মূলত ক্ষমতার চেয়েও বেশি কাঠামোগত। নির্বাচন একসময় কেবল আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিলেও, এবারের ভোটকে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। তবে বাম রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নটি মৌলিক—এই নির্বাচন কি প্রচলিত শোষণের কাঠামো ভাঙবে, নাকি কেবল শাসকের পরিবর্তন ঘটাবে?
প্রতিনিধিত্বের লড়াই ও লিঙ্গবৈষম্য
এই নির্বাচনের গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী, কারণ এটিই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায় ও নাগরিক অধিকারের গতিপথ। এমন এক ক্রান্তিকালে নারী প্রার্থীদের সংখ্যা ও অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ১,৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৭৮ জন, যা মোট সংখ্যার মাত্র ৩.৯ শতাংশ। এর মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ১৭ জন নারী। দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নারী হওয়া সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের এই সামান্য উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীরা এখনও কাঠামোগতভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে রয়ে গেছেন।
শীর্ষ নেতৃত্ব ও তৃণমূলের বাস্তবতা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক অদ্ভুত দ্বৈত রূপ দেখা যায়। একদিকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে দশকের পর দশক নারীরা আসীন ছিলেন, অন্যদিকে তৃণমূল বা সংসদীয় রাজনীতিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা সাংগঠনিক শক্তিতে নারীরা আজও পিছিয়ে। দলীয় কাঠামোতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছায়নি। এই সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে এবার আলোচনায় উঠে এসেছেন দুই পেশাজীবী নারী—ডা. মনীষা চক্রবর্তী ও ডা. তাসনিম জারা। চিকিৎসা পেশার মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা সরাসরি জনগণের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন, যা রাজনীতির চিরাচরিত ধারায় এক নতুন সংকেত দিচ্ছে।
রাজনীতির বিকল্প ও নৈতিক ধারা
আলোচিত এই দুই প্রার্থী রাজনীতিতে এক ধরনের যুক্তিবাদী ও নৈতিক বিকল্প হাজির করছেন। ডা. মনীষা চক্রবর্তী দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক পরিচিত নাম। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে। অন্যদিকে ডা. তাসনিম জারা নতুন প্রজন্মের কাছে বিজ্ঞানমনস্কতা ও নাগরিক সচেতনতার প্রতীক। কোভিড-পরবর্তী সময়ে সঠিক স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দিয়ে তিনি আস্থা অর্জন করেছেন। তাঁদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, রাজনীতি কেবল পেশাদার রাজনীতিবিদদের হাতে বন্দি থাকবে না; বরং পেশাজীবী ও সচেতন নাগরিকদেরও এখানে বড় ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও আগামীর পথ
বাংলাদেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে নারীর সামাজিক অবদানকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত করা অপরিহার্য। নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা নিরাপত্তার প্রশ্নগুলোকে আলাদা ‘নারী ইস্যু’ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের মূল এজেন্ডাভুক্ত করতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্তে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ছাড়া প্রকৃত মানবিক রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব। মনীষা চক্রবর্তী বা তাসনিম জারার মতো প্রার্থীরা হয়তো রাতারাতি সবকিছু বদলে দেবেন না, কিন্তু তাঁরা এমন এক রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন যেখানে সাধারণের কল্যাণ ও বিজ্ঞানমনস্কতা প্রাধান্য পায়। দীর্ঘমেয়াদে এই সুস্থ ধারাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও গভীর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে।
(লেখক প্রাবন্ধিক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা)
