শ্রমহীন ‘শ্রমশ্রী’র ভবিষ্যৎ অজানা

শ্রমহীন ‘শ্রমশ্রী’র ভবিষ্যৎ অজানা

ব্লগ/BLOG
Spread the love


 

  • দেবাশিস দাশগুপ্ত

এই নিবন্ধটি লিখতে লিখতে খবর এল, ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের নির্দেশ পুনর্বিবেচনার আর্জি খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। রাজ্য সরকার আশা করেছিল, সুপ্রিম কোর্ট হয়তো রিভিউ পিটিশনে ইতিবাচক সাড়া দেবে। এরপর রাজ্য সরকার কী করবে, সেটা এখন বড় প্রশ্ন।

সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন খারিজের দিনই কলকাতার বিধাননগর চাকরিহারা কিংবা চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের সাক্ষী থাকল। কোনও কোনও ছাত্র সংগঠন জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফলপ্রকাশের দাবিতে বিক্ষোভ দেখাল। কেউ মেডিকেলে ভর্তির কাউন্সেলিং বন্ধের প্রতিবাদ জানালেন। প্রতিবাদীদের কপালে জুটল পুলিশের লাঠি। চ্যাংদোলা করে বাসে কিংবা প্রিজন ভ্যানে তোলা। এরাজ্যের পুলিশ আর কিছু পারুক না পারুক চাকরিহারাদের পেটাতে পারে।

টিভির পর্দায় চাকরিপ্রার্থীদের অসহায় মুখগুলি দেখছিলাম। ২০২২ সালের টেট উত্তীর্ণরা এসেছিলেন নিয়োগের নোটিশ ঝোলানোর দাবি জানাতে।
এইসব দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে রাজ্যে কর্মসংস্থানের কী হাল। এসএসসি’র ২৬ হাজার চাকরি তো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গেলই। ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের ভাগ্যও এখন ঝুলছে আদালতে। রাজ্য সরকারের অবশ্য দাবি, সারা দেশে যখন বেকারি বাড়ছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে বেকারির হার ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া গিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর, তা সকলে বুঝতে পারছেন। এরকম অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য শ্রমশ্রী প্রকল্প ঘোষণা করলেন। ওই প্রকল্পে ভিনরাজ্যে হেনস্তার কারণে যেসব পরিযায়ী শ্রমিক বাড়ি ফিরে আসবেন, তাঁদের প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে রাজ্যে কাজের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত।

এছাড়া বাড়ি ফেরার খরচ বাবদ ওই শ্রমিকদের এককালীন পাঁচ হাজার টাকাও বরাদ্দ করা হয়েছে। ফিরে আসা শ্রমিকদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি, সপরিবারে খাদ্যসাথী কিংবা স্বাস্থ্যসাথী’র সুবিধা ইত্যাদিও মিলবে। তবে ওই শ্রমিকদের শ্রমশ্রী পোর্টালে নাম লেখাতে হবে। তাঁদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক বিভিন্ন রাজ্যে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। গত ২১ জুলাই ধর্মতলায় শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী হেনস্তার শিকার পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় ফিরে আসার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি ওই সভাতেই জানিয়েছিলেন, ফিরে এলে কাজ দেবে রাজ্য সরকার। ওই সভাতেই মমতা স্পষ্ট করে দেন, ছাব্বিশের ভোটে তৃণমূলের প্রধান প্রচারের হাতিয়ার হবে বাংলা ভাষার অপমান এবং ভিনরাজ্যে বাংলাভাষীদের হেনস্তার অভিযোগ।

খুব পরিকল্পিতভাবে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে ভাষা সন্ত্রাসের তাস খেলেছেন। তিনি মনে করছেন, এই তাস আসন্ন বিধানসভা ভোটে তাঁর দলকে মাইলেজ দেবে। তাই যত দিন গড়াচ্ছে, তত তিনি বাংলা ভাষা এবং বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হেনস্তা নিয়ে সুর চড়াচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, তৃণমূল সরকার ক্রমে ভাতা দেওয়ার সরকারে পরিণত হচ্ছে। অথচ রাজ্য চূড়ান্ত অর্থসংকটে ভুগছে। টাকা নেই বলে সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে পারছে না সরকার। অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানলে রাজ্য দেউলিয়া হয়ে যাবে বলে সরকারের আইনজীবীরা শীর্ষ আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছেন। সরকার ওই বকেয়া মেটাতে আরও ছয় মাস সময় চেয়েছে।

সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সভায় মুখ্যমন্ত্রীও বারবার রাজ্যের কোষাগারের দৈন্যের কথা তুলে ধরেন। কিন্তু এই যেখানে অবস্থা, সেখানে আরেকটা নতুন ভাতা প্রকল্প কেন? ভাতার টাকাই বা আসবে কোথা থেকে? গত জুনে রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণমন্ত্রী শশী পাঁজা বিধানসভায় জানিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত শুধু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে খরচ হয়েছে ৪৮ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। ২০২১ থেকে মমতার এই স্বপ্নের প্রকল্প বিভিন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটের ঝুলি ভরিয়ে দিয়েছে, সন্দেহ নেই। এরকম প্রায় ৫৪টি সামাজিক প্রকল্প মমতাকে ভোট বৈতরণি পার করতে সাহায্য করছে। এছাড়া রয়েছে নানা উৎসব, মেলা, খেলা ইত্যাদি। সম্প্রতি ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পে বুথপিছু ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৮০ হাজার বুথের জন্য খরচ হবে ৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই টাকা রাজ্য বাজেটে ধরা নেই। তাহলে আসবে কোথা থেকে? সুপ্রিম কোর্ট গত এপ্রিলে দুর্নীতির অভিযোগে স্কুল সার্ভিস কমিশন নিযুক্ত ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল করে দিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী তারপরই চাকরিহারা গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি কর্মীদের যথাক্রমে ২৫ ও ২০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা ঘোষণা করে দিলেন। তা নিয়ে মামলা হলে হাইকোর্ট বলল, এভাবে বসিয়ে বসিয়ে ভাতা দেওয়া যায় না। ব্যস, মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল।

এবার শ্রমশ্রী প্রসঙ্গ। বাংলার তুলনায় অন্য রাজ্যে পারিশ্রমিক অনেক বেশি বলে হাজার হাজার শ্রমিক ভিনরাজ্যে পাড়ি দেন। হাওড়া স্টেশনে দূরপাল্লার গাড়িগুলির সামনে অসংরক্ষিত কামরায় ওঠার লম্বা লাইন দেখলে তা বোঝা যায়। এখন প্রশ্ন হল, যেখানে ভিনরাজ্যে শ্রমিকরা মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা রোজগার করেন, সেখানে কেন তাঁরা পাঁচ হাজার টাকার ভাতার আশ্বাসে ফিরে আসবেন? ফিরে এলে কাজ পাবেন, সেই নিশ্চয়তা কোথায়?

আবার শ্রমশ্রী পোর্টালে নাম লেখালেই কেউ ফের ভিনরাজ্যে চলে যাবেন না, তারও গ্যারান্টি নেই। সেইসব তথ্য রাখার মতো পরিকাঠামো সরকারের আছে তো? রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদে নথিভুক্ত প্রায় ২২ লক্ষ নাম। এর বাইরে আরও কত লক্ষ শ্রমিক ভিনরাজ্যে কাজ করছেন, তা কি জানা আছে কারও? ২০২০ সালের মার্চ থেকে কোভিডপর্ব চলাকালীন প্রায় ৪০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যে ফিরে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে আবার চলে যান পরে। কোভিডপর্বে ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য প্রচেষ্টা, পরিযায়ী সহায়তা, স্নেহের পরশ ইত্যাদি নাম দিয়ে অনেক প্রকল্প করা হয়েছিল। সেগুলির কী হাল, সংশ্লিষ্ট দপ্তরও বোধহয় তা জানে না। রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস সদ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন, তাতেও অবশ্য প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের কথা বলা হয়েছে। কেন দলে দলে বাংলার মানুষ ভিনরাজ্যে চলে যাচ্ছেন, তার কারণ হিসেবে রাজ্যপালও অন্য রাজ্যে পারিশ্রমিক অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেছেন।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বাসস্থানের অপ্রতুলতাও উঠে এসেছে রাজ্যপালের রিপোর্টে। এক কথায়, খুব সংগত কারণে বাংলা থেকে প্রচুর মানুষ ভিনরাজ্যে চলে যান। বিরোধীদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী ঘোষিত শ্রমশ্রী প্রকল্প একেবারেই বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে। অর্থনীতিবিদরা মনে করাচ্ছেন, যে ডোল বা ভাতা সংস্কৃতির আমদানি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন, তাতে রাজ্য সরকারের দেউলিয়া হতে বেশি সময় লাগবে না।

অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার বা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। সুপ্রিম কোর্ট একসময় এই পাইয়ে দেওয়ার সমালোচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নিন্দা করেছেন। অথচ তাঁর দলও ডোল সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এব্যাপারে অনেক এগিয়ে বাংলার তৃণমূল সরকার।

বিজেপি বলছে, সরকারের তোষণ রাজনীতির জন্যই যত সমস্যা। তার মধ্যে আবার সরকারের ভাতা ঘোষণা। শ্রমশ্রী শেষপর্যন্ত আর পাঁচটা প্রকল্পের মতো মুখ থুবড়ে পড়বে না তো?

(লেখক সাংবাদিক)

The publish শ্রমহীন ‘শ্রমশ্রী’র ভবিষ্যৎ অজানা appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *