শ্মশানের শান্তি

শ্মশানের শান্তি

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


মধ্যপ্রাচ্যে নাকি নতুন ভোর। শান্তি ফিরেছে গাজায়। ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাতে ইতি। এর কৃতিত্বের দাবিদার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে কত হইচই। পারলে এখনই তাঁকে নোবেল দেওয়ার উমেদারি বিভিন্ন স্তাবক দেশের। এই শোরগোলের মধ্যে পিছনে পড়ে যায় মূল প্রশ্নটি- কীসের শান্তি? সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই যুদ্ধে ৬৮১৭২ জনের লাশ পড়েছে গাজায়। এই হিসেব শুধু হাসপাতালে বা নথিভুক্ত মৃত্যুর। এর বাইরে অগুনতি প্রাণ পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে।

নিহতের তালিকায় প্রতি ১০০ জনে শিশুর সংখ্যা ৩০। কম করে ২০ হাজার শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে যুদ্ধ। মহিলা মৃত্যুর হার অন্তত প্রতি ১০০-তে ১৬। আড়াই হাজারের বেশি শিশু হারিয়েছে বাবা-মা, পরিবারের অভিভাবকদের। লাশের সেই পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে কোন শান্তির গান গাওয়া হচ্ছে? নিঃসন্দেহে, যুদ্ধ বন্ধ হওয়া এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো খবর। অন্তত নরমেধ যজ্ঞ থেমেছে।

প্রায় দু’হাজারের মতো প্যালেস্তিনীয় পণবন্দিকে ইজরায়েল মুক্ত করেছে। গাজার আকাশে-বাতাসে স্বজন হারানোর হাহাকারের পরিপ্রেক্ষিতে ম্লান হয়ে যাচ্ছে এই মুক্তির খবর। নারকীয় এই পরিস্থিতির জন্য হামাসের অপরাধ অন্যতম কারণ। নীতিহীন উগ্রপন্থার যে পথ হামাস আঁকড়ে রয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। একইভাবে ইজরায়েলের উগ্র জাত্যাভিমানের সমালোচনায় কোনও শব্দই যেন যথেষ্ট নয়। দুই শক্তির লড়াইয়ের অকল্পনীয় খেসারত দেওয়ার পর শান্তি শব্দটাই পানসে লাগে।

শুধু কী মৃত্যু? গাজা তো এখন মৃত্যুপুরী। শ্মশানের নিস্তব্ধতা। লাগাতার বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণে গুঁড়িয়ে গিয়েছে প্যালেস্তিনীয়দের দেশটা। কোথাও বসতি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন, কোথাও বাড়িঘরের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে মাত্র। কোনওটিই আর বসবাসের উপযুক্ত নয়। ইজরায়েল সেনা প্রত্যাহার করে নিলেও প্যালেস্তিনীয়রা থাকবেন কোথায়? আকাশের নীচে এই আশ্রয় নেওয়াকে কি শান্তি বলা যায়? গাজার ঘুরে দাঁড়ানোর পথে হিমালয়ান সমান বাধা। সেই প্রতিবন্ধকতা সমূলে সরানো কার্যত অসম্ভব।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই দেশটায়। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজের দেশে কোণঠাসা হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে সুযোগ পেয়েছিলেন হামাসের অবিমৃশ্যকারী পদক্ষেপে। প্রায় তিন বছর টানা আক্রমণে গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ধ্বংসস্তূপে ঠাঁই পেয়েছে। যে সামান্য কয়েকটা দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে চিকিৎসকের অভাব, পর্যাপ্ত ওষুধ, চিকিৎসা উপকরণ নেই। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারা থাকলে কোন শান্তি আশা করা যায় গাজায়?

বাস্তবিক অর্থে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্জলি যাত্রা হয়ে গিয়েছে প্যালেস্তিনীয় ভূখণ্ডে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আর মাটির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী ইজরায়েলি জেদের বলি হয়েছেন। পরিস্থিতি যা, তাতে নবীন প্রজন্মের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ এখন সেখানে পুরোপুরি অন্ধকারে। দেশের অর্থনীতির ভিতটা একেবারে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। জীবিকা নেই। খাদ্যের আকাল। খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো শিশুদের মুখগুলি দেখলে অন্তরাত্মা কেঁপে যায়।

জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। অপর্যাপ্ত ত্রাণের ওপর দাঁড়িয়ে যে দেশটা ধুঁকছে, যুদ্ধ বন্ধ করলেই কি সেখানে ভোরের আলো ফুটবে? যুদ্ধ বন্ধের কৃতিত্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করতে পারেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা তাঁর জয়গানে মুখর হতে পারেন। কিন্তু প্যালেস্তিনীয়দের জীবনে সূর্যোদয় এখনও অনেক দূর। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যুদ্ধ বন্ধের খবরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ মানবতার প্রতি চরমতম অপরাধ।

বাস্তব সত্য হল, প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডকে নিশ্চিহ্ন করার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আক্রমণ চালিয়ে গিয়েছে ইজরায়েল। নিজের দেশবাসীকে রক্ষার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা হামাসের ছিল না। নিজের স্বার্থে হামাস প্যালেস্তিনীয় জনগণকে বাঘের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, রাষ্ট্রসংঘ বিরোধিতা করলেও গাজায় ইজরায়েলের বর্বরোচিত আক্রমণে এতদিন মদত দিয়েছে আমেরিকা। শান্তির কৃতিত্ব দাবি তাই নেহাতই নিজের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *