সন্দীপন নন্দী
বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। আমি জানি দুঃখের ডালি আজও উজাড় হয়নি কিন্তু একদিন হবে– নাজিম হিকমত
আসলে শোক এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিসম। অতর্কিতে গলে যেতে পারে, অচিরে ভেঙে যেতে পারে। তবু শোক যে প্রকাশ পাবেই ইহাও অনিশ্চিত, সম্ভবের অতীত। কারণ শোক দোকানশোভিত পণ্য নয় বরং একান্ত ব্যক্তিগত। পরম সন্তাপে অনন্য আত্ম অনুভূতিই শোক। যা সহসা প্রচ্ছন্ন, কদাপি প্রকট। যার উন্মেষে ফালাফালা হয় আনন্দ, উৎসব ও উপলব্ধি। অথচ শোকপ্রকাশের ন্যারেটিভ নিয়েও সমাজে সমালোচনা অশেষ, অব্যাহত, অন্তহীন। দেখা যায় সময়ে সময়ে ব্যক্তিগত শোকপালনও পারিপার্শ্বিক অভিযোগে বৃহৎ এবং বড় হয়ে ওঠে, ‘লোকে কী বলবে’! শ্মশানফেরত ক্রন্দনহীন আশ্চর্য জ্যেষ্ঠপুত্রকেও জিজ্ঞেস করা হয়, ‘বাবার জন্য দুঃখ হয় না?’ আর এভাবেই সদ্য শোকের বাড়িতে অনুতাপের মহৎ ইন্টারভিউ চলে। অথচ শোকজ্ঞাপনও যে এক পাক্ষিক অভিব্যক্তি এবং যার ক্ষণিক বিচ্যুতিতেই দুঃখরা মুহূর্তে ফাঁপা ও ফাঁকা নিয়মরক্ষার নাটক হয়ে যায়, এ তো মনস্তত্ত্বের গহন বিষয়। কিন্তু শোককালে কাউকে জোর করে কাঁদানো যেমন অনভিপ্রেত, তেমন কেউ অঝোর নয়নে কাঁদছেন, তাঁকে বিরত করাও বিশেষ বীরত্ব নয়। অথচ প্রতিটি মৃত্যুপরবর্তী সময়ে কাছের মানুষেরা দূরের মানুষেরই অংশ হয়ে যান, যা সর্বৈব সত্য এবং জন্মমৃত্যুর মাঝে অপেক্ষমাণ নিয়তির এক অদৃশ্য সেতুমাত্র। কিন্তু কালে কালে শোক সম্পর্কে মানুষের প্রভূত ভাবা প্র্যাকটিসের অন্ত নেই।
তাই গভীর শোক প্রাপ্তির পল অণুপল পেরিয়ে স্বাভাবিক হতে হবে, মূলস্রোতে ফিরতেই হবে বলে পাড়াপড়শি, অফিস কলিগের যে দাবি ওঠে তা ক্রমে অমানবিক, অসহনীয় হয়ে যায়। আদতে অনুপস্থিতির শিল্পে কেউ তো কারও বিকল্প হতে পারে না। ফলে দিনশেষে বিপুল পৃথিবীর সকলেই অপূর্ব একা হয়ে রয়।
এখন প্রশ্ন, শোক অস্তিত্বের কী বিশিষ্ট সময়সারণি হয়? নাকি শোকের উদযাপন এক এক জনের ক্ষেত্রে এক এক রকম? আসলে শোককে সময়ের প্রেক্ষিতে স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিকতার তত্ত্বে বাঁধা অর্থহীন। বরং দুঃখ-ভয়-সংকট হতে প্রত্যাবর্তনের পরও যদি জীবনে শোক ফিরে ফিরে আসে, যদি নবফাল্গুনের প্রথম দিনে চলে যাওয়া মানুষটিকে বেশি বেশি তবু মনে পড়ে, তাঁদের আসতে দাও। কিন্তু এভাবে বলপূর্বক শোক উদযাপনে হৃদয় বিক্ষিপ্ত পাপই দিয়ে যায়, যা একপ্রকার ট্র্যাজেডি। কেননা আমাদের জীবনে ছোট ছোট সুখ আছে আনন্দ নেই। দুঃখ আছে গভীর বিষাদ নেই। তাই মিলন ও বিচ্ছেদের মাঝে যে সুর বাজে, তাহার নাম হয়তো অ্যাডজাস্টমেন্ট।
এদিকে, অযুত জিজ্ঞাসা অতুল শোকেও মুহ্যমান অবলীলায় প্রশ্নবাণ ছুড়ে দেয়। কী? বন্যার পর নাগরাকাটায় অলিগলি বাড়িতে কী দীপাবলির মোম জ্বলেছিল এবার? মিরিক, সুখিয়াপোখরির ধসবিধ্বস্ত পাহাড়ি গ্রামে নেপালিদের ঢাইসু পরব হল কী প্রবল সমারোহে? তমান্নার গ্রাম কালিগঞ্জে কী গত মহরমে তাজিয়া বেরিয়েছিল? এই নিত্যশোকের পরিমার্জন আদৌ সম্ভব নাকি স্রেফ মরণকে ‘তুঁহু মম শ্যামসমান’ ভেবেই স্বর বদলায় নীরবতা? তাই উৎসবঋতু এলেই সকলের বেশি বেশি প্রিয়মুখ মনে পড়ে। যেমন গত দশমীর বিসর্জনসন্ধ্যায় নদীর পাঁকে ডুবল বান্টি। বিনিদ্ররজনীর জলযুদ্ধে ডুবুরি বডি দিলেন আত্মীয়ের হাতে। সেই থেকে ‘অমর রহে’ লেখা বান্টির বাঁধানো ছবির তলেই দুর্গাপুজোর ক’দিন জ্বলে ওঠে অনির্বাণ মোম। শুধু দুর্ঘটনার বছর পুজোয় মাইক বাজেনি বান্টির পাড়ায়। তারপর যে-কে-সেই। বরং সে পাড়ায় আজ এক বিধুর বিস্মৃতির অতীব এক স্বাভাবিক নাম বান্টি। আসলে শোকের উৎসব এমনই। ‘নয়ন তোমায় পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে’। কেউ লেখেন ‘ন হন্যতে’। তবে অধিকতর চোখে পড়ে ‘তুমি রবে নীরবে’ লাইনখানি।
তো উৎসব মরশুমেও ঘরে ঘরে ফ্রেমবন্দি চিত্রগুলো এভাবেই মৃত মানুষদের বাঁচিয়ে রাখে। যে গোপন সন্তাপের উচ্ছ্বাস নেই উদযাপন আছে, আশ্বাস নেই আগ্রহ আছে। তাইতো শীতের সকাল হয়, খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত শ্রাদ্ধের বিজ্ঞাপন দর্শনে। সেদিন সে মৃত্যুই যেন বিশেষ সংবাদ হয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। শোকসংবাদেও মানবের আত্মগৌরব ঘোষিত হয়। তারপর বরষ ফুরায়ে যাবে, ভুলে যাবে। আর এসব দেখতে দেখতেই নিভৃতে শোকের বাজার তৈরি হয়েছে। যেথায় ক্রমে শোক বিক্রি হয় আর প্রাত্যহিক প্রাণের লাভ ও ক্ষতিরা জুড়ে যায় মরণগণিতে।
তবু জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে স্টিফেন কোর্টে অগ্নিদগ্ধ নাগরিকরা অনাত্মীয়ের মতো যেন দাঁড়িয়ে থাকে আজও। হে সহনশীল চারপাশ ‘তাহাদের কথা’ মনে পড়ে? অথবা লালকেল্লা বিস্ফোরণে শিরোনামহীন মর্গে প্রাণ গেল যে কন্যার অথবা আপেল বিক্রিরত সেই অখ্যাত ভাই, যার হাত-পা ঝড়ের মতো উড়ে এল নিরুপদ্রব সন্ধ্যায়! মনে পড়ে? আচ্ছা একদা রেল দুর্ঘটনার গাইসাল, দোমোহনি বা রাঙ্গাপানির মৃতদেহের ভিড় থেকে একটি লাশের নামও কী মনে আছে আপনার? নেই। আসলে এককথায় প্রকাশিত নির্লিপ্ত উত্তরগুলো এভাবেই অহেতুক আছড়ে পড়ে। এটাই শোকবিস্মৃতির পরম ম্যাজিক ও রিয়ালিজম।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোকজ্ঞপনের রীতি ও শিরোনাম বদলায়। যে শোকের চিৎকার নেই, ছবি নেই, কলরব নেই, দখল নেই তার দৃশ্যমানতাও কমতে কমতে একসময় বিস্মৃতির ধূসরে মিশে যায়। তাই এতসব মৃতমুখের ছবিসারিরা ঘরের দেওয়ালে ঝুলে থাকে স্রেফ শোককে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
কিন্তু মহৎ গ্লানি এই যে, পণ্যসামগ্রীর ন্যায় শোকেরও এক্সপায়ারি ডেট হয়। তথাপি বিস্ময় জাগে, যখন দেখি প্রিয়জন বিয়োগ পরবর্তী মাসেই বীতশোক পরিবারটি ডাল লেকের শিকারায় ভাসতে ভাসতে সেলফি তুলছে অহরহ। আসলে বিরল এ অস্বাভাবিকতাই তো স্পিরিট অফ লাইফ, জীবন ফেরতে উচ্চস্বরের জয়গান। যাকে আমরা মানতেই পারিনি আজীবন।
তবু এটাই সামগ্রিক বিস্মৃতিতে শোক ভুলে অনন্ত ভালো থাকার পাসওয়ার্ড। যে কাজ পারতেই হয় এবং যা ক্রিকেটে ছয় বলে তিরিশ রান করার মতো কঠিন ও অনিশ্চিত। তবু সেই অলৌকিক ব্যাটিং আমরা প্রতিদিন করছি তো করছিই। শুধু পার্থক্য এই যে ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড পেরিয়ে কেউ শোক ভুলতে পারে কেউ বয়ে বেড়ায় চিরতরে।
তাই প্রতিটি শোকের আয়ু কেটেছেঁটে ওই ন’মাস ন’দিন। কারণ শোকবিস্মৃত হতে পারে বলেই মানুষ পুনরায় কাজে ফিরতে পারে, গুজরাটের মচ্ছু নদীতে সেতু বিপর্যয়ে বহু মানবের মৃত্যুর সাঁঝবেলাতেও পরকীয়ার আইনি অধিকার নিয়ে প্যানেল ডিবেটে বসতে পারে। হ্যাঁ ইহাই স্বাভাবিক, ইহাই বাঁচার বিশল্যকরণী ও সন্তাপ হরণের অবিকৃত সঞ্জীবনী সুধা।
অথচ এর পরও মৃত্যু পরবর্তী নেপথ্যে লেখা হয় দুর্দান্ত এপিটাফ, গাঁথা হয় গান, মালা পায় মৃতপ্রেয়সীর ছবিরা। আর দেখতে দেখতে একদিন উন্মুখ প্রতিমা বিসর্জনের মতো শোকও জলে ডুবে যায়, দুঃখরা দ্রবীভূত হয়। সঙ্গে অনাদিকালের ওপার হতে সুভাষ-কাকিমারা বলে ওঠে, ‘দুঃখকে স্বীকার কোরো না, মরে যাবে। মরতে হলে আনন্দের হাত ধরে মরো’।
(লেখক প্রাবন্ধিক)
