স্মৃতির অমলিন সেই মানুষগুলো নিজেদের অগোছাল জীবন সামলে আমাদের শৈশবের অন্দরমহলে আনন্দ বয়ে আনতেন।
জয়ন্ত চক্রবর্তী
একসময় পাড়ায় পাড়ায় এমন কিছু মানুষকে খুঁজে পাওয়া যেত, যাঁদের নিজস্ব ঘর-সংসার কিংবা কেরিয়ার গড়ার দৌড়ে তেমন কোনও উচ্চাশা ছিল না। তাঁরা নিজের জীবন সম্পর্কে খানিকটা উদাসীনই থাকতেন। অথচ অদ্ভুত জাদুবলে তাঁরাই হয়ে উঠতেন পাড়ার ছেলেমেয়েদের কাছে অঘোষিত অভিভাবক- কমন কাকু, জেঠু কিংবা দাদা। শৈশবের সেই দিনগুলোতে তাঁরাই ছিলেন আমাদের ‘আলিবাবা’। ঠিক যেন রূপকথার মতোই, তাঁদের সান্নিধ্য পেলেই খুলে যেত মনের সব রুদ্ধ দুয়ার। তাঁরাই আমাদের হাতে তুলে দিতেন আনন্দ আর কল্পনার আসল রসদ, যা আমাদের শৈশবকে করে তুলেছিল প্রসারিত ও বৈচিত্র্যময়।
আড্ডা ও জ্ঞানের ভাণ্ডার
বাড়ির সামনে খোলা উঠোনে বা গাছের ছায়ায় আলিবাবাদের ঘিরে বসত দীর্ঘ আড্ডা। খেলাধুলো থেকে জাতীয় রাজনীতি- তর্কের শেষ ছিল না। গাভাসকার না কপিল দেব, ইস্টবেঙ্গল না মোহনবাগান, কিংবা দেশের সরকার গঠনের সমীকরণ; সব জটিল বিষয়ে আলিবাবারা তাঁদের জ্ঞানের ঝাঁপি খুলে বসতেন। তাঁরা কেবল জ্ঞান দিতেন না, বরং যুক্তির নিরিখে তর্কের মোড় ঘুরিয়ে দিতেন। সত্যজিতের সেই বিখ্যাত সিধু জ্যাঠার মতোই তাঁরা ছিলেন আমাদের পাড়ার একেকটি জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। খবরের কাগজ আর রেডিওর খবর থেকে আহরিত সেই জ্ঞান আমাদের কৈশোরের চিন্তাধারাকে দারুণভাবে ঋদ্ধ করত।
সহমর্মিতা ও শাসন
কেবল জ্ঞানী বলেই তাঁরা জনপ্রিয় ছিলেন না, বরং ছোটদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার মহানুভবতা ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান গুণ। তাঁদের কাছে যাওয়া ছিল অত্যন্ত সহজ। ভুল করলে যেমন কড়া শাসন বা ধমক জুটত, তেমনই তার সঙ্গে থাকত একরাশ স্নেহের আশ্রয়। সেখানে শাসনের নামে ছিল না কোনও অবহেলা বা দূরত্ব, আর বিচারের নামে ছিল না বর্জন। এই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণেই তাঁরা পাড়ার প্রতিটি সন্তানের কাছে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের প্রতিটি কথার অন্তরালে থাকত জীবনকে বড় করে দেখার এক অমোঘ শিক্ষা।
জীবনবোধের পাঠশালা
উৎসবের আয়োজন কিংবা খেলার মাঠে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল অসামান্য। রবীন্দ্র জয়ন্তী থেকে নেতাজি জন্মজয়ন্তী- সবখানেই থাকত তাঁদের উৎসাহ। ডিসেম্বরের রাতে বসত ব্যাডমিন্টনের আসর, আবার গরমের ছুটিতে ফুটবল নিয়ে হাজির হতেন আলিবাবা। তাঁদের তত্ত্বাবধানে খেলায় জিততে শেখার পাশাপাশি পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করার মানসিকতাও আমরা রপ্ত করতাম। খেলার মাঠে সেই দলবদ্ধতা ও সহনশীলতার পাঠগুলো আমাদের জীবনের কঠিন সময়ে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছে। তাঁরা যেন অজান্তেই আমাদের শিখিয়েছিলেন হার-জিতের ঊর্ধ্বে উঠে জীবনকে গ্রহণ করতে।
সময়ের স্রোতে বিলীন
আটের দশকের শেষে টেলিভিশনের আগমন আর গ্রামবাংলার পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণে সেই দিনগুলো যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। আজ আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক, ব্যস্ত ও পরিকল্পিত। সেই আলিবাবারা আজ আর আমাদের মাঝখানে নেই, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ের কোণে অদৃশ্য চাবির মতো ঝুলে আছে। আজ ফিরে তাকাই যখন, তখন বুঝতে পারি সেই মানুষগুলো আমাদের শৈশবের মণিকোঠায় কতটা গভীর প্রভাব রেখে গিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের অস্তিত্বের শিকড়।
(লেখক দিনহাটা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক)
