শূন্যের ভাগ নিয়েও খুব ব্যস্ত বামেরা

শূন্যের ভাগ নিয়েও খুব ব্যস্ত বামেরা

ব্লগ/BLOG
Spread the love


আশিস ঘোষ 

এই তো সেদিনের কথা। বামফ্রন্টের বৈঠক থাকলে আমাদের মতো রিপোর্টারদের কাজ অনেক বেড়ে যেত। বৈঠক সকালে শেষ। বিকেলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএম অফিসে প্রথামাফিক সাংবাদিক বৈঠক করতেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান। এই মাঝের সময়টায় আমরা যে যার মতো ফ্রন্টের অন্য শরিকদের অফিসে ঘুরতাম। সেদিনের বৈঠকে কী কী হল, তা ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বলার আগেই জেনে যেতাম আমরা। বিশেষ করে যেসব কথা ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বাইরে বলবেন না, সেইসব কথা।

সেখানেই ছিল রিপোর্টারদের কেরামতি। সব কথা হয়তো জানতে পারতাম না। কিন্তু জানতে পারতাম অনেকটা। ১৯৮৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে আরএসপি আর ফরওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে সিপিএমের আসন সমঝোতা হয়নি। দুই শরিক তাদের জন্য বামফ্রন্টের নিয়মে বরাদ্দের চেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী দিয়ে জিতেছিল সিপিএম প্রার্থীদের সঙ্গে লড়াই করে।

সেবার যেসব জেলায় শরিকদের জোর ছিল, সেখানে শরিকি সংঘর্ষও হয়েছিল। প্রকাশ্যে দুই শরিক বিবৃতি দিয়ে সিপিএমকে ফ্যাসিস্ট বলে গাল পেড়েছিল। ভোটের পরের ফ্রন্টের বৈঠকে তুলকালাম হবে মনে হয়েছিল। ফলে তৎকালীন ফ্রন্ট চেয়ারম্যান সরোজ মুখোপাধ্যায় রেখেঢেকে বলবেন- সেটাই ছিল স্বাভাবিক। শরিকদের অফিসে হানা দিয়ে জেনেছিলাম, দুই শরিকের আপত্তিতে বৈঠকের পর বিবৃতিতে ‘ভোট শান্তিপূর্ণ’ কথাটা লিখতে পারেনি সিপিএম।

এইসব লিখছি এটা বোঝাতে যে, একদা এরাজ্যে যখন টানা ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট, তখন ফ্রন্টের মিটিংয়ে কী হল জানতে আগ্রহ যেমন ছিল সাধারণ মানুষের, তেমন ভিতরের খবর বের করা নিয়ে রিপোর্টারদের মধ্যে ছিল দারুণ প্রতিযোগিতা। আজ দেড় দশক ক্ষমতায় নেই বামফ্রন্ট। তাদের শক্তি নেহাতই প্রান্তিক। তাদের মুরোদ কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো ক্ষয়েই চলেছে। বড় শরিক সিপিএম তো বটেই, শরিকদের অবস্থা আরও করুণ। তারা আছে কী নেই ঠাহর করা মুশকিল।

সেই রাজপাট নেই। দাপটও নেই। তবে ফ্রন্টের শরিকি বিবাদ টিকে আছে দিব্যি। সামনে আবার একটা জিরোর গেরো কাটানোর সুযোগ। তাই প্রথামাফিক আসন ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা হচ্ছে, হচ্ছে কাজিয়াও। শূন্যতার মধ্যেও কে কত সিট পাবে, তা নিয়ে ঝগড়ায় খামতি নেই। একেবারে কালনেমির লঙ্কাভাগ। তার উপর ফ্রন্ট যেহেতু বামপন্থী, তাই বিবাদে তাত্ত্বিক উপাদান যথেষ্ট। সেখানেই পা কাটছে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের।

নতুন দল গড়ার পর হুমায়ুন কবীরের মন বুঝতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে বামফ্রন্টের শরিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন তিনি। ‘সাম্প্রদায়িক’ হুমায়ুনের সঙ্গে কেন আলোচনা করতে গিয়েছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক? এতে মানুষের কাছে ভুল বার্তা গিয়েছে বলে বামফ্রন্ট বৈঠকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়ে এসেছে সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি।

আবার বামফ্রন্টের বাইরে গিয়ে কখনও কংগ্রেস, কখনও আইএসএফের সঙ্গে জোট করতে কেন সিপিএম লাফালাফি করছে, তা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায়। এর মধ্যে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মিম-এর রাজ্য নেতা ইমরান সোলাঙ্কির সঙ্গেও বৈঠক করতে চেয়েছেন সেলিম। তেমনই শরিকদের দাবি।

ফ্রন্টের অন্তত এক শরিক জানিয়ে দিয়েছে, আইএসএফের সঙ্গেও হাত মেলানো চলবে না। এনিয়ে বিতর্কে বৈঠকের মাঝপথে ফরওয়ার্ড ব্লক ওয়াক-আউট করেছে। এমন ভজকট অবস্থায় কংগ্রেস আবার জানিয়ে দিয়েছে, বামেদের সঙ্গে জোট নয়। তারা একলা চলবে। এক মালায় বুদ্ধদেব আর রাহুল গান্ধির ছবি একসময় দু’দলের সমর্থকদের বুকে আশা জাগিয়েছিল। এবার তা হচ্ছে না। উলটে শরিকরা যে যার মতো সিট দাবি করছে।

বড় শরিকের সেই তাকত আর নেই বলে তাদের দু’কথা শুনিয়ে যাচ্ছে তস্য ছোট শরিকরা। সিপিএমকে শুনতে হচ্ছে। ফ্রন্ট বড় বালাই যে। ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর সামনেই সেলিমের কাজে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছেন শরিক নেতারা। গতবার বাম জোটের মান রেখেছিল একা আইএসএফ। সবেধন সিটটা তাদেরই। এবার তাদের দাবির বহর বেড়েছে। তাদের পঞ্চাশটা চাই। কোথা থেকে তাদের কত দেওয়া যাবে, তা নিয়ে এখন চুল ছেঁড়ার জোগাড় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের।

একইসঙ্গে কেরলে ভোট। এখানে কংগ্রেসের সঙ্গে দোস্তি আর কেরলে তাদের সঙ্গে কুস্তির খোঁটা এবার অন্তত শুনতে হবে না বামেদের। কিন্তু বেলা শেষে প্রশ্ন একটিই- কুল, মান ও আদর্শ বজায় রেখে শূন্যদশা কাটবে কি বামেদের? নাকি আবার ‘শূন্যহাতে ফিরি হে নাথ পথে পথে’ গানটা গাইতে হবে?



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *