নিজস্ব প্রতিনিধি
যতই প্রযুক্তি আমাদের ঘিরে থাকুক না কেন, এখনও বহু অভিভাবক বিশেষ করে মায়েরা সন্তানের স্কুল ছুটির অপেক্ষায় থাকেন। কারণ, সন্তান স্কুল থেকে ফিরলে তার সঙ্গে যে জমিয়ে গল্প করা যাবে। তাই সন্তান ফিরলে একরাশ উত্তেজনা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করেন, ‘কেমন ছিল স্কুল?’ কিন্তু সন্তান মাত্র একটি শব্দে উত্তর দেয়, ‘ভালো’। আর এতেই মায়ের সব উত্তেজনা দমে যায়। এই ‘কথার দেওয়াল’ ভেঙে শিশুর মনের গভীরে পৌঁছানোই আজকের দিনে অভিভাবকদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞ অ্যামি মরিনের মতে, আমরা যে প্রশ্ন করি, তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ব্যর্থতার বীজ। ‘কেমন ছিল স্কুল?’ – এটি একটি শুষ্ক ও সাধারণ প্রশ্ন, যার উত্তর শুধু ‘হ্যাঁ/না’ বাচক উত্তরকেই উৎসাহিত করে। যদি আমরা গভীর আত্মিক সংযোগ তৈরি করতে চাই, তাহলে আমাদের প্রশ্ন হতে হবে নির্দিষ্ট, কৌশলগত এবং অনুভূতির দিকে নির্দেশিত।
‘কেমন ছিল স্কুল?’ – প্রশ্নটি শিশুকে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনও বিশ্লেষণ বা ভাবনা প্রকাশ করতে উৎসাহিত করে না। বরং আপনার প্রশ্ন হওয়া উচিত এমন যা তার সারাদিনের ছোট ছোট ঘটনা, আবেগ বা চিন্তাকে উন্মোচন করবে। যেমন –
- আজ কোন বিষয়টা তোমার কাছে সবচেয়ে মজার ছিল?
এই প্রশ্নটি সরাসরি ইতিবাচকতা ও আনন্দের ওপর জোর দেয়। যখন আপনি ‘কী শিখেছ’ জিজ্ঞেস করেন তখন শিশুর ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। কিন্তু ‘সবচেয়ে মজার কী ছিল’ জিজ্ঞাসা করলে সে তার প্রিয় শিক্ষকের কোনও উক্তি, খেলার সময়কার কোনও মজার ঘটনা বা ল্যাবরেটরির কোনও কৌতূহলোদ্দীপক অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে। আলোচনা ইতিবাচকভাবে শুরু হলে সন্তানের মন সহজে খোলে।
- আজ কারও কোন ভুল তুমি ক্ষমা করে দিয়েছ?
এটি একটি শক্তিশালী এবং চরিত্র-নির্ভর প্রশ্ন। এর মাধ্যমে তার মধ্যেকার সহমর্মিতা এবং সামাজিক দক্ষতা কেমন কাজ করছে তা বোঝা যায়। এই প্রশ্নের উত্তরে হয়তো বেরিয়ে আসবে যে, খেলার সময় কোনও বন্ধু তাকে ধাক্কা মারলেও সে রাগ করেনি বা ভুল করলেও ক্ষমা করে দিয়েছে। এটি সরাসরি নৈতিকতা ও অন্যের প্রতি তার ভূমিকাকে জানতে সাহায্য করে।
- আজ কোন বন্ধু তোমার পাশে সবচেয়ে বেশি ছিল বা তোমাকে সাহায্য করেছে?
এই প্রশ্নটি তার বন্ধু মহলে ঘনিষ্ঠতা এবং সামাজিক বৃত্ত সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা বন্ধুত্বের মাধ্যমেই নিজেদের আবিষ্কার করে। এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি বুঝতে পারবেন কার সঙ্গে তার সম্পর্ক সুদৃঢ় এবং কারা তার ওপর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
- তুমি কি এমন কিছু করেছ, যা তোমার করা উচিত হয়নি?
শুনতে কঠিন লাগলেও, এই প্রশ্নটি স্বীকারোক্তি ও সততাকে উৎসাহিত করে। যদি আপনার সন্তান কোনও ভুল করে থাকে, তবে সে আপনার কাছে নিরাপদ বোধ করে তা বলার সুযোগ পাচ্ছে। আপনি যখন বকাঝকা করার পরিবর্তে সহমর্মিতা দেখাবেন, তখন সে ভবিষ্যতে আপনার প্রতি আরও বেশি আস্থা রাখতে শিখবে।
- আজ কোন জিনিসটা তোমায় সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে বা বিরক্ত করেছে?
প্রতিটি মানুষের জীবনেই চ্যালেঞ্জ বা বিরক্তি থাকে। কঠিন কোনও বিষয় বুঝতে না পারা বা সহপাঠীর খারাপ ব্যবহার- যে কোনও কিছুই তাকে দুঃখ দিতে পারে। এই প্রশ্নটি তার মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তার ক্ষেত্রটি চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে। আপনি তখন তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে তার মানসিক ভার হালকা করতে পারবেন।
- যদি তুমি শিক্ষক হতে তাহলে কী করতে বা কী শেখাতে?
এই প্রশ্নটি মজার, সৃজনশীল এবং শিশুটির ব্যক্তিগত অনুরাগ উন্মোচন করে। সে হয়তো বলবে, ‘আমি আজ ফুটবল খেলা শেখাতাম’, অথবা ‘আমি মহাকাশ বিজ্ঞানে হাতেকলমে কিছু করে দেখাতাম’। এর মাধ্যমে আপনি তার প্যাশন বা আগ্রহের ক্ষেত্রটি জানতে পারবেন।
- কাল ক্লাসে কী শেখানো হবে, সে বিষয়ে তোমার কৌতূহল আছে কি?
এই প্রশ্নটি ভবিষ্যৎ ভাবায় এবং স্কুলের প্রতি তার আগ্রহকে চাগিয়ে তোলে। এর উত্তরে যদি সে আগামীর কোনও পাঠের বিষয়ে উত্তেজিত থাকে, তাহলে বোঝা যায় সে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে বর্তমান ক্লাসের কথা শুনছে।
সংযোগই আসল জাদুকাঠি
এইসব প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ করা নয়, বরং আপনার সন্তানের সঙ্গে আস্থার বন্ধন তৈরি করা। যখন আপনি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করবেন, সে আপনাকে জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় ঘটনার সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে শিখবে। এতে তার আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়ে, তেমনই সে বুঝতে পারে যে তার অনুভূতি আপনার কাছে কতটা মূল্যবান।
তাই আজ থেকে সেই পুরোনো, নিরুত্তাপ প্রশ্নটি বাদ দিন। তার দিকে তাকিয়ে হাসুন আর নতুন উদ্দীপনা নিয়ে জিজ্ঞেস করুন, ‘আজ তুমি কাকে সাহায্য করেছ?’ – দেখবেন, আপনার সন্তানের মুখমণ্ডল গল্পের ঝোঁকে ঝলমল করে উঠবে।
