স্বনির্ভরতা, স্বাধীনতা এমনি এমনি আসে না। এগুলির চর্চা শুরু করতে হয় প্রথম জীবন থেকেই। শেষ বয়সেও তাহলে পরনির্ভরতা এড়ানো সম্ভব অনেকখানি।
আমার অলস চিন্তায় কয়েক বছর আগের কলকাতার একটা ঘটনাও ভেসে উঠেছিল। আমেরিকায় জন্ম হয়েছে, লেখাপড়া ওই দেশেই, এমন একটি আঠারো বছরের ছেলে কলকাতায় বেড়াতে এসেছে বাবা-মায়ের সঙ্গে। মাঝে মাঝে দেশে আসে, তখন এদিক-ওদিক যতটা পারে দেখে নেয়। সেবার ছেলেটি বাবার লেখাপড়া করার জায়গাগুলো ঘুরেফিরে দেখেছিল। এগুলির মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্সি কলেজ, খড়্গপুর আইআইটি।
কথায় কথায় ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন জিনিসটা এবার তোমার কাছে চমকে ওঠার মতো বলে মনে হয়েছে?
ছেলেটি অদ্ভুত একটি উত্তর দিয়েছিল। বলেছিল, সেদিন প্রেসিডেন্সি কলেজে ঢুকে দেখি, একটি ছেলে বিএ-তে ভর্তি হবে। কিন্তু সে নয়, তার বাবা ভর্তি হওয়ার ফর্ম পূরণ করে দিচ্ছেন। ছেলেটি বাবার পাশে বসে আছে চুপটি করে। এমন দৃশ্য আমেরিকায় আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
আমেরিকার ওই ছেলেটি বাঙালি বাবা-মায়ের স্নেহের বন্ধন কাটিয়ে একটু দূরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে একা থেকে উচ্চশিক্ষা শুরু করে দিয়েছিল। সব ব্যাপারেই ও ছিল স্বনির্ভর। উচ্চশিক্ষার জন্য একটি স্কলারশিপ পেয়েছিল, আর পকেটমানি জোগাড়ের জন্য অবসর সময়ে হোটেল-রেস্তোরাঁতে ছোটখাটো কাজও করত। জন্ম থেকে আমেরিকায় বড় হয়ে ওঠা এই ছেলেটির কাছে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের ফর্ম তার বাবার পূরণ করে দেওয়ার দৃশ্যটি অস্বাভাবিক ঠেকাই খুব স্বাভাবিক।
শিকাগোয় দিনের আলো খানিকটা ম্লান হয়ে এসেছিল। তবে আকাশের আলোর অভাব পূরণ করে দিয়েছিল বিদ্যুতের উজ্জ্বল আলো। শহরের রাস্তাঘাট ভেসে গিয়েছিল ঝলমলে আলোয়। আমি ডানদিকের রাস্তা ধরেছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই পৌঁছে গিয়েছিলাম শপিং মলের পাড়ায়। বিশাল বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। আলোর কী বাহার! ঝাঁ চকচকে বললে বোধহয় কিছুই বোঝানো হয় না। কী না আছে এখানে! ‘আপস্কেল বুটিক’ থেকে ‘ডিসকাউন্ট আউটলেট’–সব।
‘ব্লুমিংডেলস’, ‘লর্ড অ্যান্ড টেলর’, ‘নর্ডস্ট্রম’ ইত্যাদি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নাকি আন্তর্জাতিক। দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এখানে এসে বাজার করে যান। এসব জায়গায় কেনাকাটা করলে ক্রেতারা শুধু সন্তুষ্টিই লাভ করেন না, ওজনদার ক্রেতা হিসেবে তাঁদের গায়ে নাকি একটা ছাপ্পাও লেগে যায়।
কিছু কিছু ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আছে যেগুলি শুধু আয়তন আর সম্ভার দেখিয়েই চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না, পাশাপাশি অপরূপ আবহাওয়াও তৈরি করে। মনে হবে হঠাৎই বুঝি কোনও অ্যামিউজমেন্ট পার্কে এসে হাজির হয়েছি। উজ্জ্বল আলোর খামতি নেই কোথাও, তবে পথচলতি লোকজনের সংখ্যা বেশ কমে এসেছিল। বাতাসে শীতের ধার আগের তুলনায় একটু বেশি।
এবার হোটেলে ফিরতে হবে। আমার সঙ্গে রাস্তাঘাটের ম্যাপ আছে। নিখুঁতভাবে সবকিছু সেখানে এঁকে আর লিখে দেখানো হয়েছে। পথ হারাবার কোনও ভয় নেই। মাঝে মাঝে ঘাড় উলটে দু’পাশের স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো দেখে নিচ্ছিলাম।
আকাশচুম্বী অট্টালিকা। দু’পাশের অট্টালিকাগুলোর শেষ কোথায়, ঘাড় সম্পূর্ণ উলটে দিয়েও দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু যেগুলো একটু দূরে, সামনের দিকে, সেগুলোর অনেকখানি দেখা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বিভ্রম হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল কোনও অলৌকিক উপায়ে বুঝি আকাশের গায়ে থাক-থাক আলোর মালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
রাতে হোটেলের বিছানায় শুয়ে শুয়ে পরের দিনের ভ্রমণসূচিটা মনে মনে একটু আউড়ে নিচ্ছিলাম। ভ্রমণ-পণ্ডিতরা বলে থাকেন, বেড়াবার একটা ভালো ছক যদি আগেভাগে তৈরি করে রাখা যায়, অল্প সময়ের মধ্যে অনেক কিছু দেখে ফেলা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, অবশ্যদ্রষ্টব্য বস্তু বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু মার্ক টোয়েনের দেশে ভ্রমণ-পণ্ডিতরাই শেষ কথা নয়। শেষ কথা কিংবা মোক্ষম কথাটি জানার জন্য লেখকের দ্বারস্থ একবার হতেই হবে।
একটি বিখ্যাত প্রবচন আছে, কাল করব বলে কিছু ফেলে রাখতে নেই। কাল বললে কালে পায়। সুতরাং আগামীকালের কাজটা সম্ভব হলে আজকেই সেরে রাখো। উপদেশটি সবার কাছেই মূল্যবান, কিন্তু মার্ক টোয়েনের প্রকৃতি যে অন্য ধাতুতে গড়া, তিনি এই কথাটিই একটু অন্যভাবে ভেবেছেন। লেখক বেশ জোর দিয়ে বলেছেন পরশু যেটা করা যেতে পারে, কক্ষনো সেটা কাল করতে যেও না।
লেখকের বিচিত্র এই পরামর্শের কথা মনে পড়ে যেতেই একটু নড়েচড়ে উঠেছিলাম। ইশ! পরামর্শটি যদি মানা যেত। ছুটোছুটি নয়, তাড়াহুড়ো নয়, কালকের কাজ ধীরেসুস্থে পরশু পর্যন্ত গড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মজাটাও কম নয়। জায়গাটি যে দূর বিদেশ, এখানে সময় ও অর্থ দুটোই দ্রুতগতিতে ফুরিয়ে যায়। সুতরাং আলসেমি করার সুযোগ নেই। কাল যা-যা দেখার কথা ভেবে রেখেছি, পুরোটাই দেখে ফেলার চেষ্টা করব। প্রিয় লেখক মার্ক টোয়েনের উপদেশ বরং দেশে ফিরে নিষ্ঠার সঙ্গে মানা যাবে।
চমৎকার ঘুম হয়েছিল রাতে। পরদিন সকালে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঝকঝকে সকাল। সাইডওয়াকে লোকজন বিশেষ নেই। রাস্তায় গাড়ি ছুটছিল শাঁ-শাঁ করে। সোজা পথ ধরে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছিলাম।
অনেকগুলি বিষয় নিয়ে প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে শিকাগোবাসীর। যেমন আকাশচুম্বী বেশ কয়েকটা অট্টালিকা আছে এই শহরে। মেধার চর্চায় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব নামডাক। শিকাগো স্কুল অফ ইকনমিক্স এবং শিকাগো স্কুল অফ সোশিওলজির দিকে পৃথিবীর মানুষজন বেশ সম্ভ্রমের চোখে তাকিয়ে থাকে। উত্তর আমেরিকার সেরা বন্দর-শহর এই শিকাগোই। মিডওয়েস্টের অর্থনৈতিক রাজধানী হওয়ার সম্মানও পেয়েছে এই শহরটি।
শহর দেখতে দেখতে পৌঁছে গিয়েছিলাম ফিল্ড মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে। ফিল্ড মিউজিয়ামের পত্তন ১৮৯৩ সালে। তখন এটির নাম ছিল কলাম্বিয়ান মিউজিয়াম অফ শিকাগো। ১৯০৫ সালে মিউজিয়ামের নতুন নাম হল ফিল্ড মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি। মিউজিয়ামের প্রথম এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্শাল ফিল্ডের নামেই নামকরণ করা হয় মিউজিয়ামটির। ১৯২১ সালে নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয় এটি।
জাদুঘরটি পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভর্তি। প্রাচীন মিশর, পেসিফিক নর্থওয়েস্ট এবং তিব্বতের বিস্তর শিল্পকর্ম আছে এখানে। এখানকার দুটি সংগ্রহ তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। প্রথমটি নানা প্রজাতির ডায়নোসর, দ্বিতীয়টি বিশাল চেহারার জন্তুজানোয়ারের ‘ট্যাক্সিডার্মি’।
টাইরানোসরাসের কঙ্কালটি বৃহত্তম। মস্ত বড় একটি হলঘরের ওই প্রান্ত থেকে এই প্রান্ত পর্যন্ত। প্রাগৈতিহাসিক অতিকায় এই প্রাণীটির হাড়গোড়ের প্রায় নব্বই শতাংশ সংগ্রহ করা গিয়েছে।
‘ট্যাক্সিডার্মি’ বিভাগে কী না আছে। প্রথমেই আছে সুবিশাল চেহারার দুটি হাতি, এদের বিচরণভূমি ছিল আফ্রিকার জঙ্গল। সঙ্গে আছে বাঘ, সিংহ, চিতাবাঘ, হায়না, জিরাফ, জেব্রা– এককথায় নিবিড় জঙ্গলের গোটা সংসার। এও এক আশ্চর্য শিল্পকর্ম। চামড়াগুলো আসল, ভিতরে খড়, ভূসি ইত্যাদি।
চোখ, দাঁত এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে কিছু জোড়াতালি আছে, কিন্তু কিছু বোঝার উপায় নেই। এ এক অনবদ্য ট্যাক্সিডার্মি। হঠাৎ দেখলেই শুধু নয়, অনেকক্ষণ ধরে ঠায় তাকিয়ে থাকলেও বিভ্রম তৈরি হতে পারে। মনে হবে বন্যপ্রাণীগুলো জ্যান্ত। বিভ্রম দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বনভূমির যথাযথ পরিবেশও তৈরি করা হয়েছে জাদুঘরে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, যখন তিনি নিতান্তই স্বল্পপরিচিত ব্যক্তিত্ব, এক প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে একটি বই লেখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। তখন তিনি ল’ স্কুলে ছিলেন এবং ‘হার্ভার্ড ল’ রিভিউয়ের’ প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
স্মৃতিকথামূলক অনবদ্য এই বইটির নাম ‘ড্রিমস ফ্রম মাই ফাদার।’ বইটিতে কালো আফ্রিকান পিতা এবং সাদা আমেরিকান মায়ের সন্তান ওবামা এক অর্থে তাঁর শিকড় সন্ধান করেছেন।
এই বইটিতে শিকাগোকে নিয়ে সুদীর্ঘ একটি অধ্যায় লিখেছেন ওবামা। শিকাগোতে দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন তিনি। এই শহর তাঁর প্রথম যৌবনের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে আছে। শহরের সুষমা, ঔদার্য এবং বৈষম্য অকপটভাবে উঠে এসেছে এই স্মৃতিকথনে। অসামান্য এই ফিল্ড মিউজিয়ামটির কথাও আছে বইটিতে।
