- উৎপল সরকার
বিশ্ব ইতিহাসের এক অস্থির সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন জন লেনন। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন পৃথিবীকে বিধ্বস্ত করে তুলেছে, তখনই তিনি পৃথিবীর আলো দেখেন। যুদ্ধ, ব্যবসায়ীদের লোভ, সামরিক আগ্রাসন ও মানবসভ্যতার গভীর বিভাজনের মধ্য থেকে উঠে এলেন এমন এক শিল্পী, যিনি বিশ্বের কাছে শান্তির সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। লেনন কেবল বিখ্যাত গায়ক নন; তিনি ছিলেন মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি গানকে ব্যবহার করেছেন প্রতিবাদ ও পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে।
চশমা পরা, গিটার হাতে দাঁড়ানো জন লেননকে মনে পড়লে আজও প্রথমেই ভেসে ওঠে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ইমাজিন’-এর একটি গান যা শুধু সুর বা কবিতা নয়, বরং একটি পৃথিবীর স্বপ্ন যেখানে যুদ্ধ নেই, সীমান্ত নেই, ধর্ম নেই, মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের বিভাজন নেই। তাঁর গান ‘গিভ পিস আ চান্স’, ‘ওয়ার ইস ওভার’ বা ‘লাভ মি ডু’- সবই এক অর্থে সময়ের উন্মাদনার বিরুদ্ধে উচ্চারিত মানবতার ঘোষণা।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের উত্তাল সময়ে লেনন পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন যুদ্ধবিরোধী শক্তির প্রতিনিধি হয়ে। আমেরিকার ৩৬তম রাষ্ট্রপতি লিন্ডন বি জনসন যখন যুদ্ধকে আরও প্রসারিত করে তুলছিলেন, সেই ভয়াবহতার বিপরীতে লেননের অবস্থান ছিল স্পষ্ট- যুদ্ধ নয়- মানুষ; আগ্রাসন নয়- শান্তি। তাঁর ‘বেড–ইন ফর পিস’ ছিল তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও তিনি শিল্পের মাধ্যমেই তুলে ধরে ছিলেন একটি যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য- মানুষের জীবন যুদ্ধের চেয়ে মূল্যবান।
লেননের গান ও জীবন এমন একসময়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল, যখন পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত থেকে বেরিয়ে এসে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। শীতল যুদ্ধ, উপনিবেশবাদের পতন, নয়া উদারনীতির উত্থান, অস্ত্র প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে বিশ্বব্যবস্থা তখন উত্তাল। এমন সময়ে লেননের গান মানুষের মনে তৈরি করেছিল আশার আলো; বলেছিল- শান্তি মানে দুর্বলতা নয়, বরং মানুষের শক্তি। আজকের পৃথিবীতেও লেনন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা যায়, মার্কিন প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় সিআইএ’কে গোপন সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছে এবং ক্যারিবিয়ানে ১৫ হাজার সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে। সরকারি দাবি এটি মাদকবিরোধী অভিযান হলেও বাস্তবে আমেরিকার ৭০ শতাংশ নাগরিকই এর বিরোধিতা করছেন। ১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর জন লেননের মৃত্যু ঘটে আততায়ীর গুলিতে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তা ও স্বপ্ন আজও জীবন্ত। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করে গিয়েছেন, পৃথিবীতে এখনও অসংখ্য মানুষ আছেন যাঁরা শান্তির পক্ষে এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে প্রস্তুত। শিল্পীকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তার ভাবনা ও সৃষ্টিকে দমন করা যায় না।
চল্লিশ বছরের স্বল্প জীবনে জন লেনন যা রেখে গিয়েছেন, তা কেবল সংগীতের ঐতিহ্য নয়; বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গি- মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার সাহস। আজ যখন নতুন করে যুদ্ধের আগুন পৃথিবীর নানা প্রান্তে জ্বলছে, তখন লেননের কণ্ঠ যেন আবার মনে করিয়ে দেয়-
‘শান্তিকে একটি সুযোগ দাও।’
(লেখক স্বাস্থ্য দপ্তরে কর্মরত। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)
