রিচাদের বিশ্বজয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

রিচাদের বিশ্বজয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


 

  • সেবন্তী ঘোষ

শেয়ার করা এক পোস্টে দেখি, প্রতিবেশী বাংলাভাষী দেশের অভিবাসী এক কন্যা লিখেছেন, ভারত দেশটাকে তিনি হিংসা করেন। দেশভাগ হয়ে আখেরে লাভ হয়েছে ভারতের। দু’পাশের দেশের মেয়েদের প্রতি ফতোয়া, কল্লা দেওয়া, এসব ভারতের মেয়েদের সহ্য করতে হয় না। ভারতের মেয়েরা যে কোনও ক্ষেত্রে তাদের ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে। কথাটা আংশিক সত্য। সত্য এই কারণে যে, ভারতের গণতন্ত্রের চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। সুসজ্জিত ছায়াঘেরা চা বাগান দেখে মন ভরে না কার? বলা হয় ওই চা বাগানের গড় তাপমাত্রা তার পাশের এলাকা থেকে সবসময় কম। কিন্তু ওই চা বাগানটি তৈরি করতে কত শ্রম আর সময় লেগেছে সেটা ভাবুন একবার? চা গাছের উপযোগী মাটি থেকে বহুতলের সহনশীল মাটি, এই রূপান্তর নাকি তেমন অনায়াসসাধ্য নয়। চা বাগান উপড়ে তাই নগর তৈরি বড় কঠিন। আজ যে শীতল ছায়ায় মোড়া মহার্ঘ বাগান, তার পিছনে বহু শ্রমিক-মালিকের হাড়ভাঙা খাটনি সহ কৃৎকৌশল আছে। তেমনই আমাদের দেশে গণতন্ত্রের অধিকার বা উত্তরাধিকার এতই গভীরে প্রোথিত যে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার মতোই বোঝা যায় না, সে কতদূর ভিতরে চারিয়ে গিয়েছে। এই অধিকার মানুষের আত্মমর্যাদা বোধ তৈরি করে ভিতর থেকে শিক্ষিত করে।

পার্শ্ববর্তী দুই দেশের সমস্যা তার সামরিক শাসন। রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলেই সেখানে আর্মির হস্তক্ষেপ দেখা যায়। এই পদ্ধতি মৌলবাদকে পুষ্ট করে। ‘শৃঙ্খলা’ শব্দটির ভিতরে আছে শৃঙ্খলের কথা। যদি সে শৃঙ্খলার মধ্যে সযত্নের গ্রহণ-বর্জন থাকে, সহানুভূতির সংস্কার থাকে, তবে সে শৃঙ্খলা গ্রহণীয়। কিন্তু তথাকথিত সামরিক শৃঙ্খলার ভিতরে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয়। আমাদের দেশের সংবিধান প্রণেতারা এবং তার রূপায়ণে সফল নেতারা সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আমলাদের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত রেখেছেন। এই আমাদের আশীর্বাদ। এই কারণে চাইলেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে আমাদের দেশে হঠাৎ করে সামরিক অভ্যুত্থান সম্ভব নয়। এ বিষয়ে আম্বেদকর ছাড়াও অধুনা দু’বেলা তিরস্কার করা জহরলাল নেহরু ও তার কংগ্রেস দলের কৃতিত্ব অস্বীকার করা যায় না।

এছাড়াও আরও একটি বড় বিষয়, বিভিন্ন জাতিধর্ম মিশ্রিত, বিপুল কলেবর সম্পন্ন এই বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডটির ভৌগোলিক অবস্থা। প্রাকৃতিক কারণেই তার খাদ্য, পোশাক, সংস্কৃতি বহুবিধ। ঠান্ডায় জমে যাওয়া পাহাড়ে যারা থাকছে, সমুদ্রতটের উষ্ণতায় যারা স্নাত হচ্ছে, ভেজা বা শুষ্ক অরণ্যে যারা বন্যজন্তুর মোকাবিলা করছে, মরুভূমির বালিঝড়ে উটের পিঠে মুখ গুঁজছে, তারা সবাই এক দেশের বাসিন্দা, এটাই আমাদের অন্যতম ইউএসপি। আপাতভাবে এই জগাখিচুড়ি অবস্থায় গোলমাল বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এর একটি সুবিধার দিক, এক দেশে থেকেও পরস্পরের পছন্দ-অপছন্দ রক্ষা করা যায়। তাই গোবলয়ের কন্যা ভ্রূণহত্যা আর পরিবারের হাতে সম্মান রক্ষায় খুন, উত্তর-পূর্বে কোনও ছাপ ফেলে না। বাঙালি, অসমিয়া, খাসি, মণিপুরি, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকার মেয়েরা দীর্ঘকাল ধরেই স্বাধীনচেতা। কেউ রসনায়, কেউ প্রহারে, এক ঘা পেলে ১০ ঘা দিয়ে ছাড়ে!

এইভাবেই পরস্পরের সঙ্গে যেমন অপছন্দের দূরত্ব রাখা যায়, তেমন আবার এক দেশ হওয়ার কারণে সমান অধিকার অর্জনের ইচ্ছা জাগে। পরিশ্রম নিয়ে আসে সাফল্য। সাফল্য প্রশ্ন করার স্পর্ধা জোগায়। মনে হয়, একই দেশের অন্য রাজ্যে মেয়েরা যে কাজটি করতে পারছে, সেটি তারা কেন পারবে না? বিশেষ করে যখন তারা কঠোর অনুশীলন জাত দক্ষতায় সমালোচক, নিন্দুকের মুখ বন্ধ করে দিতে পারে। এভাবেই নানা সমীকরণে হরিয়ানার মতো কড়া পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সম্পন্ন রাজ্যের গ্রামে, মফসসলে কুস্তিগির মেয়েদের দেখতে পেয়ে যাই আমরা। বছর ত্রিশেক আগেও কল্পনায় আনতে পারতাম না, শক্ত চোয়ালের জাঠ পুরুষের এলাকা, হরিয়ানার মেয়েরা গায়ে মাথায় ধুলো কাদা মেখে শরীরী বিক্রমে, অজস্র চোখের সামনে স্বেদসিক্ত যুদ্ধ করে চলেছে।

গণতন্ত্রের, বহুত্বের এই চর্চা, অনুশীলন আমাদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব ধরনের মানুষের ভিতরে প্রবেশ করেছে। ক্রমশ কমলেও অন্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে এখনও কথা বলে চলেছেন সাধারণ নাগরিক। প্রতিকার হয়তো সব ক্ষেত্রে হচ্ছে না কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন। যেটা তাঁরা ভেবেছিলেন সেই ‘ভিনি ভিডি ভিসি’ এদেশে এখন সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। মেয়েরা, যে যেদিকে যতটুকু স্বাধীনতা পেয়েছে, কোনও মূল্যেই এখন আর ছাড়তে রাজি নয়।  তাদের ঘরে ঢোকাবার চেষ্টা করলেও এই দেশে সেটা সম্ভব নয় আর। আজ এই ভারতের ক্রিকেট খেলা মেয়েদের বিশ্বজয় বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। এ এক ধারাবাহিক উত্তরণের কাহিনী। বলা যায়, বহু মানবীর বহু প্রয়াস, ব্যর্থতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের প্রতীক। রিচা ঘোষ উত্তরবঙ্গ তথা শিলিগুড়ি তথা আমাদের এলাকার এক গর্ব মাত্র নয়, সে ভারতের সেইসব মেয়েদের প্রতিনিধি, যারা দেখিয়ে এসেছিল যে পুরুষ ও নারীর শারীরিক গঠনে তফাত ছাড়া আর বিশেষ কোনও পার্থক্য নেই। এ ওকে ছোট করে দেখানোয় মহত্ত্ব নেই কোনও। মেয়েরা পারে না এমন কোনও কাজ নেই। নেই পুরুষের সঙ্গে কোনও প্রতিযোগিতা। তাকে দেবী করে মাথায় চড়াবার কোনও প্রয়োজন নেই, দাসী করে রাখার তুচ্ছতাচ্ছিল্যের অধিকার নেই।

হার আর জিতের মধ্যে বড় একটি তফাত আছে। ডায়না এদুলজি বা ঝুলন গোস্বামী কম বড় ক্রিকেটার নন। কিন্তু তাঁরা এককভাবে খ্যাতনামা। সেভাবে তাঁরা হয়তো তাঁদের মতো করে দল পাননি।  পিছনে জয় শা, বিপণন বা ভাগ্য বা তৎকালীন জনসাধারণের মানসিকতা- যে কোনও কারণই থাকুক না কেন, রিচারা বিশ্বজয়ী হয়েছেন। যতদিন অবধি আপনি চেষ্টা করে যাবেন, কিন্তু প্রার্থিত সাফল্য পাবেন না, ততদিন চিত্র একরকম থাকে। এই জয় মেয়েদের ক্রিকেটকে যে সম্ভ্রমের আসনে বসিয়ে দিল, সেটা প্রায় একটা যুগ পরিবর্তনের মতো। এখনও মনে আছে কলকাতায় রুবি পার্কের সামনে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে দেখছি, দেওয়ালে বড় বড় করে ঝুলনের নামে বিতর্কিত কুমন্তব্য। সেই প্রথম আমি ঝুলন গোস্বামীর নাম শুনি। তারপর থেকে তাঁর খেলার খবর রাখতে শুরু করি। ঝুলন বর্ষসেরা ক্রিকেটার হয়ে অনেক আগেই তার উত্তর দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু আজ সংঘবদ্ধভাবে একটা গোটা দল যেভাবে আমাদের, বিশেষ করে মেয়েদের জিতিয়ে আনল, তাতে আগামীদিনে ওই ধরনের মন্তব্য লেখার স্পর্ধা হবে না কারও।

(লেখক সাহিত্যিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *