রাহুলের যাত্রা বনাম বিহারের বাস্তব

রাহুলের যাত্রা বনাম বিহারের বাস্তব

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


প্রসূন আচার্য


বিহারে রাহুল গান্ধি, তেজস্বী যাদব, দীপঙ্কর ভট্টাচার্যদের ১৬ দিনের ভোটার অধিকার যাত্রা সাধারণ মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলায় চর্চা চলছে, তাহলে কি ২০ বছরের নীতীশ জমানার অবসান আসন্ন? ক্রমে শতাংশের হারে জনপ্রিয়তা খোয়ানো নীতীশ কুমারকে এবার কি গদি ছাড়তে হচ্ছে? এবারও যে নীতীশকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরে বিজেপি ভোটে যাচ্ছে। নীতীশ ক্ষমতা হারালে তো বিজেপির বিহার বিজয় আগামী ১০-১৫ বছরের জন্য গল্প হয়ে যাবে।


পাঁচ বছর আগে বিহারের ভোট ছিল সমানে সমানে। ফলাফল ছিল নীতীশের নেতৃত্বে এনডিএ ১২৫। তেজস্বী-কংগ্রেস-বামেদের জোট ১১০। অন্যরা ৮টি। বিহারে বিধানসভা আসন ২৪৩। অর্থাৎ হাফওয়ে মার্ক ১২৩। মাত্র কয়েকটি আসন তেজস্বী, রাহুলরা বেশি জিতলে গতবারই নীতীশ হেরে যেতেন। যে কারণে ভোটের পর একবার নীতীশ পালটি মেরেও ছিলেন। পরে আবার মোদির হাত ধরেন।

২০২০ সালে নীতীশের খারাপ ফলের অন্যতম কারণ ছিল রামবিলাস পাসোয়ানের পুত্র চিরাগ। ভোট কেটে নীতীশকে হারিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি নেমেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সবাই একজোট হয়ে লড়ায় বিধানসভাভিত্তিক ফল দাঁড়ায় এনডিএ ১৭৪ এবং মহাগঠবন্ধন ৬২। ব্যবধান বিস্তর। এই পরিস্থিতিতে এবার ভোটের তিন মাস আগে রাহুলদের ভোটার অধিকার যাত্রা।

ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)-কে কেন্দ্র করে শুধু বিহারে নয় গোটা দেশে হইচই পড়ে, সংসদ অচল হয়, সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়, প্রাথমিক খসড়া তালিকায় বাদ যায় ৬৫ লাখ ভোটারের নাম এবং রাহুলের নেতৃত্বে ‘ইন্ডিয়া’ জোট বিজেপির ভোট চুরিকে ইস্যু করে। এর ফলে ভোটার অধিকার যাত্রা অন্য মাত্রা পেয়ে যায়।


এবার দেখে নিই এনডিএ’র ঘরের অবস্থা। নীতীশ এবং বিজেপির মধ্যে খুব বড় সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু এবারও চিরাগ ফ্যাক্টর আছে। বিশেষ করে রাহুলের যাত্রার পর দলিতদের একাংশ যেমন মুশাহার, মাল্লা জনগোষ্ঠীগুলি কংগ্রেস-আরজেডি জোটের দিকে ঝুঁকে যাওয়ায় চিরাগ ফ্যাক্টর আরও বড় হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে চিরাগ শতাধিক আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।

পাসোয়ানরা দলিতদের মধ্যে সবথেকে প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী। চিরাগের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন আছে। সেই হিসেবে চিরাগ ৪০-৫০ আসনের কমে সমঝোতায় যাবেন না। তাঁর লোক জনশক্তি পার্টি ২০২০ সালে ১৩৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জিতেছিল মাত্র একটিতে। চিরাগের কারণে এনডিএ ২৭টি আসনে হেরেছিল। ১০টি আসনে চিরাগের দল দ্বিতীয় হয়েছিল। প্রায় ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

যে কারণে ২০২৪ সালে চিরাগকে তড়িঘড়ি জোটসঙ্গী করে নেন অমিত শা এবং চিরাগ ৫টি লোকসভা আসন জেতেন। সেই ভোটের হিসাব ধরলে ২৯টি বিধানসভা কেন্দ্রে চিরাগের দল এগিয়ে এবং এবার নাম না করে নীতীশকেই টার্গেট করছেন রামবিলাস-পুত্র। বিহারের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এনডিএ জোটের আরেক শরিক উপেন্দ্র কুশওয়াহা। তিনিও নানা আবদার করছেন। কৈরী নেতা। এই জাতের ভোট আছে ৪ শতাংশের বেশি। বিগত ভোটে তাঁর দল ভালো করতে পারেনি বলে অমিত শা’র পক্ষে তাঁকে ম্যানেজ করা মুশকিল হবে না। শেষপর্যন্ত বিজেপি যত আসনই ছাড়ুক, নীতীশকে মেনে নিতেই হবে মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকার জন্য।

এবার ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দিকে তাকাই। গতবার বিহারে কংগ্রেসের স্ট্রাইক রেট ছিল সব থেকে খারাপ। ৭০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জিতেছিল মাত্র ১৯টি। সিপিআই(এমএল)-লিবারেশন ১৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১২টি জিতেছিল। আরজেডি ১৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৭৫টি জেতে। বিজেপির থেকে একটি বেশি। তখনই বিরোধী শিবিরের বক্তব্য ছিল, গ্রাউন্ডে কংগ্রেস নেই। বুথে কংগ্রেস কর্মী নেই। অধিকাংশ জায়গায় বুথ কমিটিই নেই। শুধু হাওয়া আর রাহুলের ভরসা। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের আরও কম আসনে লড়া উচিত ছিল। তাহলে নীতীশ-বিজেপি হেরে যেত।

কংগ্রেসের একাংশ সেকথা মানেননি, এমনটা নয়। ঠিক ছিল, কংগ্রেস এবার ৫০টির বেশি আসনে লড়বে। কিন্তু রাহুলের যাত্রায় উন্মাদনা দেখে আবার কংগ্রেস আবদার জুড়েছে তারা ৭০-এর নীচে লড়বে না। জোটসঙ্গী হিসেবে দুটি লোকসভা আসন জেতায় লিবারেশন তাদের দাবি বাড়িয়েছে। তাঁদের নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তাঁরা ৪০টির কমে লড়বেন না। পুরো যাত্রাপথ সঙ্গে থাকা পিছড়ে বর্গের নেতা মুকেশ সাহানি জানিয়েছেন, তাঁকে শুধু বেশি আসন দিলেই হবে না, উপমুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করে ভোটে যেতে হবে।

আরজেডি আর লিবারেশন ছাড়া ভোটের দিন বুথ আগলে পড়ে থাকার মতো কর্মী এই জোটের অন্য দলগুলির নেই। তা সত্ত্বেও তারা বেশি আসন চাইছে। সিপিআই ও সিপিএম কম নেবে, এমন ভাবার কারণ নেই। তার উপর ওই যাত্রার সময় অখিলেশ যাদব আগাম ঘোষণা করেছিলেন, তেজস্বী হবেন মুখ্যমন্ত্রী মুখ। কিন্তু দিল্লিতে খাড়গের সঙ্গে বৈঠকের পর সেকথা খারিজ করে দিয়েছে কংগ্রেস। তাদের মতে, যা হবে ভোটের পর। ফলে স্বস্তিতে নেই বিরোধী শিবির।

এবার দেখা যাক, ‘এসআইআর’-এর খেলা কতটা কার্যকর করতে পারল নির্বাচন কমিশন এবং এই কাজে যুক্ত নীতীশ সরকারের কর্মীরা। কারণ সরকারি কর্মীরা স্কুল শিক্ষক হোন বা পঞ্চায়েত বা পুরসভার কর্মী, তাঁরাই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের কাজ করেছেন। প্রশাসন যা বলেছে, তাঁদের সেটাই শুনতে হয়েছে। এই কাজে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেটা গোটা দেশ জেনে গিয়েছে।

কিন্তু শেষপর্যন্ত কী হল? যে ৬৫ লাখ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে, তার মধ্যে ২০-২২ লাখ মৃত হলে বাকি ৪৫ লাখের কতজনের নাম উঠল? পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম কি উঠল? মহিলাদের নাম বেশি করে বাদ গিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বৈধদের কি নাম উঠল? খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সাকুল্যে কয়েক লাখের নাম উঠেছে। সংখ্যাটি বাদ পড়া নামের ১০-১২ শতাংশের বেশি নয়। অন্যদিকে, ৩ লাখ ভোটারকে চিঠি দিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে।

কংগ্রেসের অভিযোগ, তাদের বুথ লেভেল এজেন্টরা যে প্রায় ৫০ লাখ আবেদন নিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলি গ্রাহ্য করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে আধার কার্ড বৈধ হয়েছে বটে, কিন্তু তাতে খুব বেশি লোকের নাম উঠবে, তা নয়। অর্থাৎ, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় বিরোধী দলের ভোটারদেরই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাহলে সেটাই ফাইনাল তালিকায় থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাহুল-তেজস্বীদের ভোটার অধিকার যাত্রায় সাড়া পড়লেও, ভোট চুরির প্রাথমিক ধাপে বিজেপি কিন্তু এগিয়ে গেল।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহিলাদের একাংশের ভোট নিশ্চিত করায় সেই পথে সবাই হাঁটছে। বিজেপি একই কায়দায় মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওডিশায় জিতেছে। হেমন্ত সোরেন জিতেছেন ঝাড়খণ্ডে। এবার নীতীশ সেই পথ ধরলেন। এমনিতেই শরাব বন্দি অর্থাৎ মদ বন্ধ করে নীতীশ মহিলাদের ভোটের বড় অংশ পেয়েছেন। এবার তিনি ২ কোটি ৭৭ লাখ মহিলার জন্য ২৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করেছেন। দেওয়ালির আগেই প্রায় ২ কোটি মহিলার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার করে টাকা ঢুকে যাচ্ছে।

স্কিম হচ্ছে, নানা ধরনের স্বনির্ভর কর্মসূচি দেখিয়ে মহিলাদের জীবিকা প্রকল্পে নথিভুক্ত হতে হবে। ‘যোগ্য’ হলে তাঁরা ব্যবসা করার জন্য ২ লাখ টাকা পাবেন। তার মধ্যে আপাতত ১০ হাজার ভোটের আগে। আশাকর্মীদের ভাতা এক থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার করে দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেস-আরজেডি’ও বলছে, ক্ষমতায় এলে তারা মহিলাদের মাসে আড়াই হাজার টাকা দেবে। সঙ্গে ৫০০ টাকায় গ্যাস। কিন্তু জিতলে তো! তার আগেই যে হাতেগরম নীতীশের টাকা।

সব মিলিয়ে বিহারি খেল জমেছে। তবে পাল্লা কিঞ্চিৎ নীতীশের পক্ষেই ভারী। অন্তত আজ পর্যন্ত।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *