রাজনীতির গর্ভগৃহে এক সংস্কৃতিঋষি – Uttarbanga Sambad

রাজনীতির গর্ভগৃহে এক সংস্কৃতিঋষি – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


  • পার্থপ্রতিম মিত্র

কী করে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়া যায়? কুন্দন শাহ জানতে চাইছেন তাঁর শিক্ষক ঋত্বিক ঘটকের কাছে। ঋত্বিক ঘটক তখন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। ভারতীয় চলচ্চিত্রের উত্তর যুগের ডাকসাইটে তাবড় পরিচালক- যেমন কুমার সাহানী, মণি কাউল, সাঈদ মির্জা- তখন তাঁর ক্লাসঘরে। সবাইকে একটা জোর ধাক্কা দিয়ে ঋত্বিক বলে উঠেছিলেন, ‘পাঞ্জাবির এক পকেটে একটি বোতল আর অন্য পকেটে নিজের ছেলেবেলাকে পুরতে পারলে।’ কিন্তু উলটোদিকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস যে বলেছিলেন, ‘শিল্পী ঋত্বিক মদ স্পর্শ করেননি।’

সাতের দশকের শুরুর দিকে যাওয়া যাক। এক জ্যোৎস্না-ঝরা রাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রামপুরহাটের অদূরে খোয়াইতে গর্জন করতে করতে এগিয়ে চলা এক জিপে দেখছেন ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’র ইউনিট ঠাসাঠাসি করে বসে চলেছে শুটিংয়ে, সামনে ড্রাইভারের আসনের পাশে বসে ঋত্বিক। অর্ধেক দেহ ঝুলছে বাইরে। হাতে মদের বোতল। ঋত্বিক ঘটক নকশাল রাজনীতির বিরোধী ছিলেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলছেন তাঁর কমরেডকে, ‘‘এরা কেরিয়ারিস্ট হতে পারত। না হয়ে বিপ্লবী হয়েছে। আপনার ছবিতে ‘লস্ট ডেজ’-এর বদলে ‘বার্নিং এজ’-এর কথা বলুন।’’ এই আলোচনার স্বর্ণালি ফসল ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’। এখানে শেষ দৃশ্যে নীলকণ্ঠ (ঋত্বিক) নকশালদের এক ডেরায় এসে ওঠে। ‘তোমরাই তো সব। দ্য ক্রিম অফ বেঙ্গল। বাট মিসগাইডেড।’ নীলকণ্ঠ / ঋত্বিক বলছেন, ‘আমি কনফিউসড। ফুললি কনফিউজড!’ রাজনৈতিক ঋত্বিক তার আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্রে বলছেন এ কথা! বলছেন, ‘সব পুড়ছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে, আমিও পুড়ছি, কিছু তো একটা করতে হবে।’ এরপর, তাঁর চিত্রনাট্যই নকশাল তরুণদের সঙ্গে পুলিশি এমবুশে তাকে মেরে ফেলবে। সাউন্ড ট্র্যাকে বেজে উঠবে পঞ্চম সিম্ফনি।

গোবরা মানসিক হাসপাতালে ঋত্বিককে শঙ্খচিলের গান শোনানোর আগে তার জ্বলে ওঠা চোখের দিকে তাকিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলতে থাকে, ‘মানতে পারি না ঋত্বিক সম্পর্কে লস্ট জিনিয়াস তত্ত্ব। শিল্পী ঋত্বিক কোনও দিন মদ স্পর্শ করেননি। অবশ্য ক্রিয়েটিভ সোল কোনওদিনই নেশা করে না।’ এমনটাই বলছেন সত্যজিৎ রায়ও। কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের নিজের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি এ নিয়ে অভিযোগ তোলে।

সত্যজিৎ রায়-মৃণাল সেন-ঋত্বিক ঘটক- এই ত্রয়ী চলচ্চিত্র পুরুষের মধ্যে সত্যজিৎ উদারনৈতিক বামপন্থী, মৃণাল স্বঘোষিত মুক্তকচ্ছ কমিউনিস্ট, আর ঋত্বিক নিজে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। একটু ভালোভাবে দেখলেই দেখা যাবে ঋত্বিকের পাজামাতে লেগে রয়েছে ওপার বাংলার পদ্মাপারের মাটি। চোখের চশমাটা শ্রেণিবীক্ষণের। শরীরটা মৃদুমন্দ আন্দোলিত হচ্ছে কোন লোকগানের সুরে। মগজে পার্টি। হৃদিতে মাতৃভাব। রক্তে গণনাট্য। ঋত্বিকের একহাতে মার্কস, আর আরেক হাতে?

ফ্যাসিবাদী উন্মত্ততা, মহামারি ও মহাযুদ্ধের সময়কার বিপন্নতাই ঋত্বিককে কমিউনিস্ট করেছিল। ১৯৪৩ সাল। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ প্রযোজনার মধ্যে দিয়ে এই বাংলায় গণনাট্য সংঘের আত্মপ্রকাশ। কমিউনিস্ট ঋত্বিকের গণনাট্য সংঘে যোগদান আরও তিন বছর পর, ১৯৪৬-এ। ওপার বাংলার রাজশাহী কলেজ ছেড়ে ছিন্নমূল ঋত্বিক চলে এলেন বহরমপুর। তারপর দাঙ্গা বিধ্বস্ত কলকাতায়। যুক্ত হলেন আইপিটিএ-তে। আগ্নেয় সময়বৃত্তে ঋত্বিক প্রথমে কবিতা লিখতেন, তারপর ছোটগল্প, এখান থেকে নাটকে। ’৫২ সালে ‘ভোটের ভেট’ নির্বাচনি নাটক করছেন ঋত্বিক। পরিচালনা করছেন রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’। নিজে রঘুপতির ভূমিকায়। তাঁর প্রথম লেখা নাটক ‘জ্বালা’ (১৯৫০)। ১৯৫২-তে নির্মাণ করছেন চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’, ওই বছরই লিখলেন ‘দলিল’। তার ‘দলিল’ প্রযোজনা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সর্বভারতীয় সপ্তম সম্মেলনে প্রথম পুরস্কার লাভ করে। ১৯৫১ সালেই পিসি যোশির অনুরোধে ঋত্বিক ভারতীয় গণনাট্য সংঘের কলকাতা সেন্ট্রাল ব্রাঞ্চের সেক্রেটারি হন। পিসি যোশির কাছে ঋত্বিক ছিলেন ‘পিপলস আর্টিস্ট’। গণনাট্য সংঘের মূল নীতির খসড়া তৈরি করেন ঋত্বিক। ‘গণনাট্য সংঘ লোকসংস্কৃতিকে জাতীয় জীবনের ব্যথাবেদনা-আশার সঙ্গে যুক্ত করবে।’– খসড়ায় এ ছিল ঋত্বিকের দৃপ্ত ঘোষণা। বলা হয়, এ খসড়ায় মাও সে তুঙের ইয়েনান ফোরামের প্রভাব ছিল। ১৯৫৪-তে ঋত্বিক ঘটক কমিউনিস্ট পার্টিকে যে দলিলটি দেন তার শিরোনাম ‘অন দ্য কালচারাল ফ্রন্ট’। সুরমা ঘটক জানাচ্ছেন, সেই সময় ‘নাগরিক’ মুক্তি পায়নি। মনে প্রচণ্ড হতাশা। বাড়িতে প্রচণ্ড অর্থাভাব। তবু প্লেখানভ ও লেনিন ওয়ার্কস পড়ে পার্টিকে দিলেন এই দলিল। ঋত্বিক চেয়েছিলেন এই থিসিসটি নিয়ে পার্টির ভিতর মতাদর্শগত আলোচনা চলুক। কিন্তু তা হয়নি। বহু পরে ১৯৯৩-তে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টি দপ্তরের ফাইলপত্র ঘাঁটতে গিয়ে দলিলটি খুঁজে পান। এই দলিল রাজনীতি-সংস্কৃতি সংশ্লেষণের এক মতাদর্শিক দিশা। পার্টির সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক নিয়ে বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ।

কি দরকার ছিল এই দলিলের? এই দলিল লিখে তো ভোটে জিতে মন্ত্রী হওয়ার কথা না! অন্য কোনও সংকীর্ণ স্বার্থও চরিতার্থ হতে পারে না! তবে? এ দলিল নিয়ে গবেষণা করতে কলকাতায় এসেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এরিন এলিজাবেথ ও’ডোনেল। এই দলিলের শেষে পার্টির প্রভিন্সিয়াল কমিটির সেক্রেটারিকে ঋত্বিক লিখেছিলেন দীর্ঘ চিঠি। তার উত্তর তিনি পাননি। এই সময় নানাভাবে ঋত্বিক বিরোধিতা শুরু হয়। ঋত্বিককে ‘গ্রুপ থিয়েটার’ নামে নাট্যদল বানিয়ে কাজ করতে হয়। শেষমেশ ডাকযোগে একদিন পত্র এসে পৌঁছায়, তাঁকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এরপর ঋত্বিকের সৃজনশীলতায় আসে অন্য বাঁক। কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর ‘মাদার আর্কিটাইপ’-এর প্রভাব। যেমন- ‘মেঘে ঢাকা তারার’ নীতা চরিত্রের মধ্যে আমরা দেখি জগদ্ধাত্রী প্রতিমার আর্কিটাইপাল বিচ্ছুরণ! নীতার জন্ম জগদ্ধাত্রীপুজোতে। নীতা যে জগতের ধাত্রী। মহাকালের সঙ্গে তার মিলন হয় মৃত্যুতে। ঋত্বিক ভাষ্যে, ‘তাকে আমি কল্পনা করেছি শত শত বছরের বাঙালি ঘরের গৌরীদান দেওয়া মেয়ের প্রতীক রূপে।’ কোমলগান্ধার-এ অনসূয়াকে পথশিশু আঁচল টেনে ধরে, শকুন্তলা আর হরিণ শিশুর অনন্য প্রতীকী ব্যঞ্জনা! ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’-তে দেখি বঙ্গবালার মধ্যে দুর্গা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। বঙ্গবালা মাতৃমূর্তিতে অভিষিক্ত হয় ছৌনাচের মুখোশের মাধ্যমে। ‘কেন চেয়ে আছ গো মা মুখপানে?’ নারীত্বকেন্দ্রিক কমিউনিস্ট রাজনীতি গড়ার আহ্বান গণনাট্যিক সৃজনে ঋত্বিকের উত্তুঙ্গ বিন্দু কেউই ছোঁয়ার চেষ্টা করেনি। ঋত্বিক পুরাণ বা মিথকে ব্যবহার করছেন মাকর্সবাদকে ভারতীয় প্রেক্ষিতে দাঁড় করানোর জন্য। একটি দেশের আবহমান ঐতিহ্যকে ধারণ করেছেন ধমনীর উষ্ণস্রোতে। চেয়েছিলেন দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মিলন।

আমরা জানি, স্বাধীনতার পর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মুম্বইয়ের প্রযোজকদের ডেকে সভা করেছিলেন। প্রচ্ছন্ন ছিল রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদ। এইসময় সমবায় ভিত্তিতে ‘নাগরিক’ চলচ্চিত্র নির্মাণের সাহস দেখিয়েছিলেন ঋত্বিকই। ‘শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না’, একমাত্র ঋত্বিকের মুখেই মানানসই। ঋত্বিক স্বতন্ত্র। কেন স্বতন্ত্র? বামপন্থী সৃজনশীল শিল্পীদের আঁকড়ে ধরা পশ্চিমী মানবতাবাদ, আর মূলস্রোতের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মধ্যযুগীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের বাইরে ঋত্বিক তৃতীয় ধারা!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *