উভয়সংকটে চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকরা। এসএসসি’র নতুন বিজ্ঞপ্তি মেনে নিয়োগের পরীক্ষা দিতে নারাজ তাঁরা। অথচ পরীক্ষা না দিলে ৩১ ডিসেম্বরের পর চাকরিটাই চলে যাওয়ার আশঙ্কা। তাই তাঁদের প্রতি মুহূর্ত কাটছে দুশ্চিন্তায়। ফের পরীক্ষা না দেওয়ার ব্যাপারে চাকরিহারাদের বক্তব্য যুক্তিসংগত। এসএসসি ও রাজ্য সরকারের দুর্নীতি ও ভুলের খেসারত তাঁরা কেন দেবেন? তাঁদের দোষ কোথায়?
খেটেখুটে ভালো পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন। তারপর এত বছর শিক্ষকতা করেছেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য পড়াশোনার সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পর্ক নেই। নিজেরা এখন সংসারী। নতুন করে পড়াশোনা, পরীক্ষা দেওয়া কি সম্ভব? নিঃসন্দেহে ন্যায্য যুক্তি। কিন্তু ফের পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশটা তো দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশ না মেনে উপায় কী? উপায় একটাই। রিভিউ পিটিশন।
সেটা শীর্ষ আদালতে জমা পড়েছে। তবে তাতে আশার আলো নেই বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের চাকরি বাতিলের রায়ের পর নেতাজি ইন্ডোরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্বাসকে বিশ্বাস করে আশার আলো এতদিন দেখেছিলেন শিক্ষকরা। সেই আশাভঙ্গ হয়েছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারত যে, সুপ্রিম কোর্ট যেখানে চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের কী দাম আছে?
নেতাজি ইন্ডোরে মমতা ভরসা দিয়েছিলেন, ‘একজনেরও চাকরি যাবে না। আপনারা কাল থেকে স্কুলে যান।’ মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস ছিল, ‘আমার প্ল্যান এ, বি, সি, ডি, ই– সব তৈরি। ২০২৬ নয়, ডিসেম্বরের মধ্যেই সব সমাধান হয়ে যাবে।’ তৃণমূল নেত্রীর সেই আশ্বাসের অসারতা এখন প্রমাণিত। মাঝখান থেকে চাকরিহারারা বিভ্রান্ত হলেন। অথচ তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর ওপরে আস্থা রাখতে চেয়েছিলেন।
চাকরিহারাদের কারও বাড়িতে হয়তো গুরুতর অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা, কারও শ্বশুর বা শাশুড়ি হয়তো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। এখন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষকদের ওই আশ্বাস দিয়েছিলেন যাতে আরজি কর মেডিকেলের ঘটনাটির মতো আরেকটি নাগরিক আন্দোলন দানা না বাঁধে। তার জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। মুখ্যমন্ত্রীর সেই কৌশল পুরোপুরি সফল।
রাজ্য সরকার এবং শাসকদলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকরা তেমন জোরদার আন্দোলন গড়েই তুলতে পারলেন না। বরং এতদিন মুখ্যমন্ত্রীর গালভরা আশ্বাসে বিশ্বাস করার পর এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, পরীক্ষা দেওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে বিকল্প পথ তেমন নেই। কারণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ তেমনই। মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা যেতেই পারে যে, পরীক্ষার কথা শীর্ষ আদালত প্রথম দিন বললেও তিনি এতদিন সেটা বলেননি কেন?
চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের বিক্ষোভ-আন্দোলন ঠেকানোর জন্য নিশ্চয়ই। যে কথা মুখ্যমন্ত্রী এপ্রিলের গোড়াতেই বলে দিতে পারতেন, সেটা ঘোষণা করলেন মে মাসের চতুর্থ সপ্তাহে। ততদিনে চাকরিহারাদের মধ্যে ভাঙন ধরেছে। তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি মঞ্চ ও সংগঠন। শিক্ষাকর্মীরা ইতিমধ্যে আলাদা হয়ে গিয়েছেন। কেননা, তাঁরা কিছুটা নিশ্চিন্ত যে, মাস গেলে গ্রুপ-সি ও ডি কর্মীরা যথাক্রমে ২৫০০০ ও ২০০০০ টাকা ভাতা পাবেন।
সবচেয়ে বিপদ আদালত ঘোষিত ‘দাগি’ শিক্ষকদের। তাঁদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ, বেতন বন্ধ, চাইলেও পরীক্ষা দিতে পারবেন না। তার সঙ্গে এত বছরের বেতন ফেরত দেওয়ার বিপদ। যদিও তাঁদের অভিযোগ, অযোগ্যতা প্রমাণই হয়নি, ওএমআর শিটের দোহাই দিয়ে অন্যায়ভাবে তাঁদের অযোগ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে এসএসসি’র নিয়োগ পরীক্ষার নতুন বিধি যোগ্য শিক্ষকদের ক্ষোভের আরেক কারণ। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রায় লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
এককথায় তাঁরা দিশেহারা। সব মিলিয়ে এক জটিল, অসহায় পরিস্থিতির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন তাঁরা, যার সহজ কোনও সমাধান নেই।
