রূপায়ণ ভট্টাচার্য
এক মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ছিল, রাত বারোটার পরে বিহারের কোনও মহিলাকে অচেনা কেউ ছুঁলেই পরদিন সকালে তিনি পদত্যাগ করবেন। এবং এক মুখ্যমন্ত্রী পুলিশকে বলেছিলেন, তাঁর পশ্চিমবঙ্গে মা-বোনদের দিকে কেউ আঙুল তুললে সেই আঙুল ভেঙে দিতে হবে।
প্রথমজন সম্রাট চৌধুরী। দ্বিতীয়জন শুভেন্দু অধিকারী।
শুনে আমরা প্রবল আশ্বস্ত হয়েছিলাম, যাক, নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে আবির্ভাব ঘটেছে আপসহীন দুই প্রশাসকের। দেবী আসছেন দিন কয়েক পরেই। সারা দেশ জেগে উঠবে মাতৃবন্দনায়। তার মাঝে এসব আশ্বাস আশা জাগাচ্ছিল দলমতনির্বিশেষে। অথচ মহিলাদের ওপর অত্যাচার থামল কই! বাস্তবের নৈরাজ্যের ছবিটা তুলছে অন্য প্রশ্ন।
বিহারে অন্তত তিন শহর জামুই, বাঁকা, সমস্তিপুরে একের পর এক মহিলাকে হেনস্তার অভিযোগ সামনে এল গত কয়েকদিনে। বাংলায় শুভেন্দুর ওই ঘোষণার পরদিনই দেখলাম, কলকাতায় তৃণমূলের নব্য নেত্রী উপাসনা চৌধুরীর ওপর হামলা। তাঁর পোশাক ছিঁড়ে ফেলা হল রাস্তায়। সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ছাত্রীরা আক্রান্ত হল ক্যাম্পাসেই। মুখ্যমন্ত্রীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরেই এক বাড়িতে মাঝবয়সি মহিলা ও তাঁর পুত্রবধূর মুখ বেঁধে ধর্ষণ করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠল। নির্যাতিতা মহিলার স্বামীর দাবি, অভিযুক্ত চারজনই বিজেপি ঘনিষ্ঠ।
কই, কারও তো কোনও আঙুল ভাঙল না! কোনও মুখ্যমন্ত্রী সকালে উঠেই পদত্যাগও করলেন না। বুঝলাম, ও সব স্রেফ কথার কথা ভাই, প্রতিশ্রুতি বাই বাই।
তাহলে কি বিরোধী নেত্রীর ওপর হামলা হলে এক নিয়ম, শাসক নেত্রীর ওপর হামলা হলে আলাদা নিয়ম? সে তো আদ্যিকাল থেকে দেখে আসছি। বদলালটা কী তা হলে! বিজেপির বিরুদ্ধে কথা বললেই দেশবিরোধী!
বাংলার এক মন্ত্রীর স্পর্ধিত প্রতিশ্রুতি, ‘আমায় একবার দায়িত্ব দিয়ে দু’ঘণ্টার জন্য ব্ল্যাকআউট করে দিক, দেশবিরোধীরা ঠান্ডা হয়ে যাবে।’ বাংলায় বিরোধীরা মার খেলেই কমিক স্টাইলে বিজেপি নেতারা তিন ধরনের কথা বলছেন এখন। ১) এই মারধর আমাদের কর্মীরা কেউ করেনি, আমাদের দল যুক্ত নয়। ২) এটা জনরোষের ফসল। ৩) এটা তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফল। যেন বাক্সে তিনটে কাগজ রাখা আছে, যে কোনও একটা তুলে নিয়ে বলে দিলেই হল। প্রশ্ন হচ্ছে, যেই মারপিট করুক, তাদের ধরে জেলে পাঠানো হল না কেন। এই প্রশ্নটারই উত্তর মিলছে না। নারীদের ওপর হামলার ক্ষেত্রেও এক কথা। যে দুটো ঘটনা আগের জমানাতেও রুটিন ছিল।
তা হলে মুখ্যমন্ত্রীদের হুংকার কি মহিলাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নাকি রাজনৈতিক বক্তৃতার অলংকার? রসিক কারও মন্তব্য, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তো বলেছিলেন, মা-বোনেদের দিকে আঙুল তুললে ভাঙতে হবে। এখন তো কেউ আঙুল তোলেনি। তাঁদের মারধর হয়েছে, পোশাক ছেঁড়া হয়েছে। দুটো এক কথা নয়। আর বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তো যুক্তি দিয়েছিলেন, রাত বারোটার পরের কথা। জামুইয়ের ঘটনা যে হয়েছে ভরসন্ধ্যায়। তার দায় কেন সম্রাটমশাই নেবেন! যদিও বিজেপির এক সাংসদই বলেছেন, বিজেপির জাতীয় সভাপতির রাজ্যে পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তা হলে এমন প্রতিজ্ঞা করতে যাওয়া কেন?
এমনিতেই রাজধানী নয়াদিল্লিতে মহিলা নিগ্রহ, ধর্ষণের ঘটনা অন্তবিহীন। সোমবারই যা নিয়ে উদ্বেগ-ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। প্রশ্ন তুলেছে, নির্ভয়ার ঘটনার এক যুগ পরেও এত গাফিলতি কেন। পাশাপাশি আরও দুই ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যে দুটি ঘটনা নিয়ে হইচই প্রবল।
ওডিশার ঢেঙ্কানল জেলার কপিলাশ শিব মন্দিরের পথে এক তরুণ ও তাঁর সঙ্গিনীর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আবার সামনে এনেছে এক পুরোনো প্রশ্ন। ভারতের রাস্তাঘাটে মহিলাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কি শুধুই পুলিশের? নাকি সমাজের একাংশ নিজেরাই ঠিক করে দিতে চাইছে, একজন মহিলা কার সঙ্গে কোথায় যেতে পারবেন? দেবতার কাছে যাচ্ছিলেন তাঁরা। অথচ দেবতার মন্দিরে পৌঁছানোর আগেই একদল মানুষের হাতে হেনস্তার শিকার হতে হল।
ওডিশার ঘটনা প্রকাশ্য রাস্তায় নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে। মহারাষ্ট্রের ঘটনা সামনে নিয়ে আসে অন্য এক ভয়ংকর বাস্তবতা। মহিলাদের কাছে চেনা পরিসরও অনেক সময় হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। রায়গড়ের বাসিন্দা ৩১ বছরের পিঙ্কি হনুমন্ত কাটকরের ঘটনাটি তার বড় প্রমাণ। অন্তঃসত্ত্বা পিঙ্কিকে খুন হতে হল। যেখানে অভিযোগের তির তাঁর খুব কাছের মানুষের দিকেই। ঘটনাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, ঘরের ভেতরে বা পরিচিত গণ্ডিতেও নারীরা কত অরক্ষিত।
ওডিশা বা মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী নারীদের ওপর আক্রমণ নিয়ে কী ভাবছেন, জানা যায়নি। এখানেই সম্রাট ও শুভেন্দুর বক্তব্যে এক উল্লেখযোগ্য মিল। দুজনেই কড়া ভাষায় নারী নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে জানেন তো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে কঠোর ভাষা এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এক জিনিস নয়। পদত্যাগের প্রতিশ্রুতি অপরাধ প্রতিরোধ করে না। একইভাবে আঙুল ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও তদন্ত, বিচার এবং অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির বিকল্প হতে পারে না। বাংলায় আবার গত চার মাসে এনকাউন্টারে মৃত্যু ঘটেছে দুটো। জেল হেপাজতেও মৃতকে পাওয়া গিয়েছে।
আরও একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই এখানে। রাজনৈতিক পরিচয় কি নির্যাতিতার প্রতি প্রশাসনের আচরণকে প্রভাবিত করে? বিরোধী দলের কোনও নারী আক্রান্ত হলে শাসকদল কি একই গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানায়? আবার শাসকদলের কোনও মহিলা আক্রান্ত হলে বিরোধীরা কি রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্ন বিবেচনা করে? নারী নিরাপত্তায় সব পক্ষের রাজনৈতিক দ্বিচারিতার অভিযোগ যাচাই করতে হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন।
বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন, তাঁর প্রতিশ্রুতির বাস্তব অর্থ কী? জামুই, সমস্তিপুর এবং বাঁকার ঘটনায় অপরাধ প্রতিরোধে কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছে? বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও প্রশ্ন, তাঁর কঠোর নির্দেশের পরে উপাসনার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে প্রশাসন কী করেছে? রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই রাজ্য সরকার কতটা সক্রিয়?
ভারতে মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য কোনও মুখ্যমন্ত্রীর নাটকীয় প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যেখানে মেয়েরা রাত বারোটায় যেমন নিরাপদ বোধ করবেন, তেমনই দিনের আলোয় নিজের রাজনৈতিক মতপ্রকাশে ভয় পাবেন না।
আদতে প্রশ্নটা পদত্যাগ কিংবা আঙুল ভাঙার নয়। প্রশ্ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের। সেই দায়িত্বের উত্তর বক্তৃতায় নয়, পাওয়া যাবে প্রশাসন ও পুলিশের নিরপেক্ষ কাজে। দেবীপক্ষের আগে, দেবী আবাহনের আগে নারী নিরাপত্তার কথা ভাবা উচিত ভালো করে।
ও হ্যাঁ, কোনও নারীকে পরোক্ষে গৃহবন্দি করে রাখার হুমকি আজকাল গ্রামীণ নেতাকেও মানায় না।

