- অতনু বিশ্বাস
বিস্তর গণ্ডগোল লেগেছে দুনিয়ার অভিজাততম বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটিতে। এমনিতে এইসব বিজ্ঞান সংস্থার খটোমটো কাজকর্মে সাধারণ মানুষের নৈমিত্তিক আগ্রহ থাকার বড় একটা কথা নয়, যদি না সেটা বৃহত্তর সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পারে। এবারের বিষয়টা তেমনই। বিষয়ের কেন্দ্রে ধনকুবের এলন মাস্ক- দুনিয়ার ধনীতম মানুষ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরে যাঁর রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা এখন বাঁধন-ছেঁড়া পর্যায়ের।
মহাকাশ থেকে সুনীতা উইলিয়ামসদের সফল প্রত্যাবর্তনে আবার নতুন করে খবরের শিরোনামে মাস্ক। তাঁর সংস্থা স্পেসএক্স এই অভিযানের সঙ্গে জড়িত। ট্রাম্প বন্ধু মাস্ক দাবি করেছেন, তিনি বাইডেনের আমলেও এই কাজ করতে চেয়েছিলেন। তাঁকে করতে দেওয়া হয়নি। এই বিতর্কে জড়ানোর আগে আর এক বড় বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিতর্কে জড়িয়েছেন মাস্ক।
ঘটনাটা ব্রিটেনের ৩৬৫ বছরের পুরোনো অভিজাত বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান রয়্যাল সোসাইটিকে নিয়ে, যা দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। বিভিন্ন সময়ে যার ফেলো ছিলেন আইজ্যাক নিউটন, চার্লস ডারউইন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কিংবা স্টিফেন হকিং-এর মতো বিজ্ঞানের জগতের মহানক্ষত্ররা। ঝড় উঠেছে সেই অভিজাত প্রতিষ্ঠানের অন্দরে। যার আঁচ পড়েছে সামগ্রিক সমাজজীবনেও। এবং তা একইসঙ্গে সংশয়ে ফেলেছে এমন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ভূমিকাকেও।
রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হিসেবে কোনও বিজ্ঞানীকে নির্বাচিত করা হয় এক কঠিন বাছাই পদ্ধতির মাধ্যমে। এই সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হওয়াকে তাই অনেকেই কোনও বিজ্ঞানীর জীবনের চূড়ান্ত সম্মানপ্রাপ্তি হিসেবে মনে করেন। বাস্তবিকই তা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান সম্মানগুলির অন্যতম। গত কয়েক মাস ধরে কিন্তু প্রবল দাবি উঠেছে মাস্কের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোশিপ কেড়ে নেওয়ার।
এমনিতে রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনই সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়াটাও তো রোজ রোজ ঘটে না। আসলে প্রত্যেক সোসাইটিরই কিছু আচরণবিধি থাকে, যা মানতে হয় সদস্যদের। রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ কেড়ে নেওয়ার ঘটনা বোধকরি শেষবার ঘটেছিল প্রায় আড়াইশো বছর আগে, ১৭৭৫ সালে। বিভিন্ন জালিয়াতি এবং বিশ্বাসের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগে রয়্যাল সোসাইটি থেকে সেবার বিতাড়িত হন জার্মান বিজ্ঞানী এবং লেখক রুডলফ এরিক রাসপে। আর আজ দুনিয়ার ধনীতম মানুষটির নানা ধরনের আচরণকেও ‘বিজ্ঞানের প্রতি হুমকি’ বলে মনে করছেন দুনিয়ার বহু বিজ্ঞানী। সেইসঙ্গে তাঁরা দাবি তুলেছেন মাস্কের ফেলোশিপ প্রত্যাহার করার। আর তাই প্রবল আলোড়ন তুলেছে বৃহত্তর সমাজেও। কারণটা সহজবোধ্য- তিনি এলন মাস্ক বলে কথা।
এ বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ হিসেবে প্রথম ফেলোশিপ পরিত্যাগ করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক স্নায়ুমনোবিজ্ঞানের এমিরেটাস অধ্যাপক ডঃ ডরোথি বিশপ। গত বছর দু’বার তিনি অভিযোগ জানান রয়্যাল সোসাইটিতে। দু’ক্ষেত্রেই সোসাইটি পরামর্শ নেয় আইনজ্ঞদের। কিন্তু কিছু করে ওঠে না আইনি ঝঞ্ঝাটের ভয়ে। তারপর এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মিলার পদত্যাগ করেন ফেব্রুয়ারিতে। তারপর পদত্যাগ করেন বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক জীববিজ্ঞান এবং জনসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অধ্যাপক কিট ইয়েটস। তালিকা বাড়তে থাকে। নামজাদা সংবাদপত্র এনিয়ে খবর আর প্রতিবেদন ছাপতে থাকে। চাপ বাড়তে থাকে রয়্যাল সোসাইটির ওপরেও।
তারপর ঝড় ওঠে। বৃহত্তর বিজ্ঞান সমাজের প্রায় ৩,৫০০ বিজ্ঞানী স্বাক্ষর করেন এক খোলা চিঠিতে, যার বয়ান লিখেছেন লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের স্ট্রাকচারাল বায়োলজির এমিরেটাস অধ্যাপক স্টিফেন কারি। চিঠিটা রয়্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ব্রিটিশ রাশি বিজ্ঞানী স্যর অ্যাড্রিয়ান স্মিথকে উদ্দেশ্য করে লেখা। এই চিঠিও যেন এক হতাশার প্রকাশ। তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একজন ‘গডফাদার’ এবং ২০২৪-এর পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টন- যিনি নিজে রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলোও বটে- তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখলেন, মাস্ককে ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটি থেকে বহিষ্কার করা উচিত। হিন্টনের মতে তা মাস্ক ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচার করেন এবং নাৎসি স্যালুট করেন বলে নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলির যে বিশাল ক্ষতি তিনি করছেন সেই কারণে।
অনেক বিশিষ্টজন এবং রয়্যাল সোসাইটির ফেলোই কিন্তু বিশ্বাস করেন যে কিছু ব্রিটিশ রাজনীতিবিদকে নিয়ে মাস্কের সাম্প্রতিক মন্তব্য লঙ্ঘন করেছে রয়্যাল সোসাইটির ফেলোদের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি। আজকের ট্রাম্প প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মাস্ক। সেই ক্ষমতার অঙ্গ হিসেবে মাস্কের আচরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। মার্কিন সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি বা ‘ডজ’-এর শীর্ষপদে থাকাকালীন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অভূতপূর্ব পরিমাণ সরকারি অনুদান হ্রাস করার ক্ষেত্রে মাস্কের অবদান প্রভূত। এছাড়াও মাস্কের বিরুদ্ধে তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এর মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে। মাস্কের কোম্পানি নিউরালিংক মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে কম্পিউটারের সংযোগ ঘটাতে সচেষ্ট। কিন্তু এক্ষেত্রে রয়েছে স্বচ্ছতার অভাবের গুরুতর অভিযোগ। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে গুড ল্যাবরেটরি প্র্যাকটিস না মানার অভিযোগ। এছাড়াও, আমেরিকার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের ওপর মাস্কের আক্রমণ এবং অ্যান্টনি ফাউসির মতো বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে তাঁর অপবাদমূলক অভিযোগকেও ভালো চোখে দেখেননি অনেক বিজ্ঞানী। এছাড়াও মাস্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ভ্যাকসিন নিয়ে জনগণের দ্বিধাকে উসকে দেওয়ার এবং জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়ে সন্দেহবাদী হয়ে ওঠার। মোট কথা, বৈজ্ঞানিক মাপকাঠিতে অভিযোগ অনেক। এবং গুরুতর।
রয়্যাল সোসাইটির ফেলোর সংখ্যা ১,৭০০-র বেশি। তাঁদের মধ্যে স্টিফেন কেরির চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেছেন ৬০ জনেরও বেশি। তবে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সকলেই যে এর সঙ্গে একমত, তেমন নয়। বিভিন্ন কারণে, অবশ্যই। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক স্যর আন্দ্রে গেইম যেমন বলেছেন যে, খুব কম লোকই বলতে পারেন যে তাঁরা জীবনে মাস্কের মতো অর্জন করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মাস্কের ফেলোশিপ প্রত্যাহার করা রাজনৈতিকভাবেও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার দাবি করেছেন যে, মাস্ককে অপসারণ করলে তা বিজ্ঞানের প্রতি জনসাধারণের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে, কারণ তা রাজনীতি এবং বিজ্ঞানের মধ্যে বিভাজন রেখাকে অস্পষ্ট করে তুলে নষ্ট করবে বিজ্ঞানের অখণ্ডতা। তা ক্ষতি করতে পারে বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতার। বিজ্ঞানের রাজনীতিকরণ উচিত নয়, এমনটাই বলছেন তাঁরা।
কিন্তু এলন মাস্ককে অভিজাত বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত করাই বা হয়েছিল কেন, সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। এবং এ প্রশ্ন এখন উঠছে বারবার। মাস্ককে ফেলো মনোনীত করা হয় ২০১৮-তে। সোসাইটির মতে, সেটা ছিল বিজ্ঞানে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। অবদানটা কী ছিল? রয়্যাল সোসাইটির ঘোষিত কারণ ছিল- মাস্ক ছিলেন তাঁর কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’-এর প্রধান ডিজাইনার, যেখানে তিনি তত্ত্বাবধান করেছিলেন পৃথিবীর কক্ষপথ এবং অবশেষে অন্যান্য গ্রহে অভিযানের জন্য রকেট এবং মহাকাশযানের উন্নয়নের; বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি ‘টেসলা’-র পণ্যের নকশা, প্রকৌশল এবং উৎপাদনের তত্ত্বাবধান করেছিলেন তিনি; ‘নিউরালিংক’-এ মানবমস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য অতি-উচ্চ ব্যান্ডউইথ ব্রেন-মেশিন ইন্টারফেস তৈরি করেছিলেন তিনি; এবং তিনি বোরিং কোম্পানিতে একটি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের সঙ্গে দ্রুত, সাশ্রয়ী টানেলিং প্রযুক্তি একত্রিত করেছিলেন। এছাড়াও, অতীতে তিনি ছিলেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইন্টারনেট পেমেন্ট সিস্টেম পে প্যাল এবং প্রথম ইন্টারনেট মানচিত্র এবং দিকনির্দেশনা পরিষেবাগুলির মধ্যে একটি জিপ২-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা।
এতে কিন্তু সন্তুষ্ট নন অনেক তাবড় তাবড় বিজ্ঞানী। তাঁদের যুক্তি হল, এলন মাস্ক নিজে তো উদ্ভাবক নন, নন একজন শিক্ষাবিদ। বরং তিনি একজন প্রকৌশলী এবং ব্যবসায়ী। তাই সোসাইটি কেন তাঁকে ফেলোশিপটি দিয়েছিল সে বিষয়ে সোসাইটির আত্মসমালোচনার অবকাশ আছে বৈকি।
মার্চের গোড়ায় একটি বৈঠক হয় রয়্যাল সোসাইটির। সোসাইটি সার্বিকভাবে বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানী উভয়ের ওপর ভুল তথ্য এবং আদর্শগতভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণের বিরুদ্ধে আরও সম্ভাব্য পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিবৃতিতে কিন্তু উল্লেখ করা হয়নি মাস্কের নাম। বৈঠকের ফলশ্রুতিতে এলন মাস্কের রয়্যাল সোসাইটি ফেলোশিপ এখনও বহাল রয়েছে। এবং বহাল থাকে এলন মাস্কের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোশিপ।
তবে, গল্পটি এখানে শেষ নাও হতে পারে। এলন মাস্কের ফেলোশিপ পর্বটি রাজনীতি, সমাজ এবং বিজ্ঞানের মধ্যে একটি অভূতপূর্ব সংঘাতের ত্রিভুজ তৈরি করেছে। তা সমাজবিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাকে রূপ দিতে চলেছে নতুন করে।
চূড়ান্ত ফলাফল যা-ই হোক না কেন, মাস্কের কর্মকাণ্ডের ফলশ্রুতিতে অভিজাত রয়্যাল সোসাইটির সদস্যদের মধ্যে যে বিভাজন দেখা দিয়েছে তা এই মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে- এবং সার্বিকভাবে এ গ্রহের ক্ষেত্রেও- বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড, বৈজ্ঞানিক আচরণবিধি আর দর্শন, এবং বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের অনুশাসনে হয়তো আনতে পারে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
(লেখক কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক)
