মাথায় ভেঙে পড়তে পারে স্যাটেলাইট

মাথায় ভেঙে পড়তে পারে স্যাটেলাইট

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


সুমন গোস্বামী

আটের দশকে বেড়ে ওঠা মানুষের স্কাইল্যাব-এর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? পত্র-পত্রিকার বাইরে মূলত গুজবের কারণে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও জনমানসের একাংশে জমে উঠেছিল ভয়- আক্ষরিক অর্থেই ‘মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া’র ভয়। পৃথিবীর বাইরে মহাকাশযান পাঠানোটাও যে বিপদের হতে পারে, এ তথ্য সেবারই প্রথম এসেছিল আমজনতার মনোঅলিন্দে। আজকের দিনে কিন্তু ব্যাপারটা অন্য ধরনের নানা ভয়ের পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। কীরকম? আসুন, দেখা যাক।

সেদিনের কথা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক দশকের মধ্যেই দুই নতুন সুপার-পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে ‘রকেট পাঠানো’র প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। প্রথম পৃথিবীর বাইরে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো, প্রথম মানুষ পাঠানো, চাঁদে মানুষ পাঠানো, সৌরজগতের সর্বত্র অনুসন্ধানী যান পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলছিল আমাদের জ্ঞানের পরিধিও। এই দুই মহাশক্তিধরের সঙ্গে ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের মতো অন্য দু-একটি দেশও রকেট উৎক্ষেপণ চালিয়ে যাচ্ছিল বটে, তবে এই সকল কাজকর্মই ছিল প্রবলভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। বেসরকারি সংস্থার পক্ষে এই কাজ বড় একটা সম্ভবপর হয়নি। ১৯৬২ সালে AT & T প্রথম বেসরকারি বাণিজ্যিক উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে (Telstar 1)। পরবর্তী কয়েক দশকে বেসরকারি উদ্যোগে উপগ্রহ উৎক্ষেপণ কিছু হয়েছে অবশ্যই, তবে নাসা বা সোভিয়েত দেশের রাষ্ট্রীয় উৎক্ষেপণের তুলনায় তা নগণ্য।

আজকের ছবি

নতুন শতকে এসে চিত্রটা কিন্তু একেবারে বদলে গেল। ইলন মাস্ক-এর স্পেস এক্স বা জেফ বেজোস-এর ব্লু অরিজিন-এর মতো সংস্থাগুলো এখন মহাকাশ অভিযানের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে। কীরকম? আসুন, দেখা যাক। ২০২৬ সালের গোড়ার হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের তামাম উৎক্ষেপণের আশি শতাংশ করেছে স্পেস এক্স। পৃথিবীর বাইরে এই মুহূর্তে সক্রিয় কৃত্রিম উপগ্রহের প্রায় ৬৫ শতাংশ (৯৫০০-এর বেশি) হল স্টার লিংক-এর। জোনাথন স্পেস রিপোর্ট এই তথ্য দিয়ে আরও জানাচ্ছে যে, অন্যান্য অরবিটাল অবজেক্ট ধরলে এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাইরে অবস্থানরত উৎক্ষিপ্ত বস্তুসংখ্যা ৩০ হাজারেরও বেশি! সক্রিয় উপগ্রহের সংখ্যা ১৪৫০০-এর মতো। এর মধ্যে লো-আর্থ অরবিট (অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের ১৬০ কিমি থেকে ২০০০ কিমি অবধি) এলাকাতেই রয়েছে ১২ হাজারের বেশি কৃত্রিম উপগ্রহ!!

দুর্ঘটনার ভয়

সেই ১৯৭৮ সালে নাসার বিজ্ঞানী ডোনাল্ড কেসলার এবং বার্টন ক্যুর-পালাইস ‘কেসলার সিনড্রোম’-এর কথা বলেছিলেন। যা আসলে লো-আর্থ অরবিটে বিভিন্ন উপগ্রহ এবং মহাকাশ আবর্জনার ঘনত্ব বেড়ে ভয়ংকর দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ১৯৭৮ সালে এটি আশঙ্কা থাকলেও, অনেক বিজ্ঞানীর মতেই আজ কিন্তু বিপর্যয়টা একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাপারটা কীভাবে হয়? একে তো প্রচুর পরিমাণে সক্রিয় কৃত্রিম উপগ্রহ ওই এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার উপর রয়েছে নিষ্ক্রিয় বা নষ্ট হয়ে যাওয়া উপগ্রহ এবং উৎক্ষেপক রকেটের ভাঙা অংশ। এগুলোকে বলে ‘স্পেস ডেব্রি’। সেকেন্ডে ৭-৮ কিমি গতিবেগে এই যন্ত্রাশংগুলো লো-আর্থ অরবিটে ঘুরপাক খাচ্ছে। কোনও একটি মুখোমুখি সংঘর্ষ মানেই ডেব্রির সংখ্যার আরও বৃদ্ধি অনিবার্য। এইভাবে একটি চেইন-রিঅ্যাকশনের আশঙ্কা করেছিলেন কেসলাররা। যা গোটা সিস্টেমটাকেই প্রায় ধ্বংস করে ফেলবে।

বিপদের রকমফের

কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এই ঘটনায়? এক কথায় আপনার-আমার বর্তমান দৈনন্দিন জীবনযাত্রাই থমকে যাবে। ইন্টারনেট মুখ থুবড়ে পড়বে, জিপিএস কাজ করবে না। ব্যাংকিং, টেলিকম, যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আবহাওয়া দপ্তর পর্যন্ত- প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা কেবল ব্যাহত হবে তাই নয়, অনেকগুলিই একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। যেহেতু পৃথিবী থেকে বের হবার আর কোনও রাস্তা নেই, ফলত মহাকাশ গবেষণার প্রয়োজনেও নতুন রকেট পাঠানোটা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। শেষ একশো বছরে মহাকাশ গবেষণায় আমরা যে তুমুল উন্নতি করেছি, তা থমকে যেতে পারে ‘রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম’-এর কারণে। এই মুহূর্তে পৃথিবী ও সূর্যের Lagrange Level (এমন জায়গা, যেখানে পৃথিবী ও সূর্যের মহাকর্ষ বল সমান) এ অবস্থান করে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ক্রমাগত বদলে দিচ্ছে আমাদের মহাবিশ্বকে চেনার পরিসীমা। কিন্তু পরবর্তীতে আরও উন্নত কোনও টেলিস্কোপ পাঠানোটাও এরপর কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কঠিন হয়ে উঠতে পারে আমাদের ‘দ্বিতীয় ঘর’ খোঁজার কাজটিও, স্টিফেন হকিং সহ অনেকের মতেই যা মানবজাতির সমূহ বিপদ।

সতর্কতা প্রয়োজন

১৯৬৬ সালে রাষ্ট্রসংঘের আইনি উপসমিতিতে Outer House Treaty নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯৬৭ সাল থেকে তা কার্যকরী। মোট ১৭টি পয়েন্টের এই চুক্তি মূলত মহাকাশকে সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা বলে (Province of all Mankind)। এখানে সবার অধিকার সমান, কোনও বৈষম্য নেই। মহাকাশে বিপুল ধ্বংসক্ষমতার অস্ত্রের অবস্থানও নিষিদ্ধ করেছে এই চুক্তি। চাঁদ বা অ্যাস্টরয়েড সহ কোনও মহাজাগতিক বস্তুর ওপর রাষ্ট্রীয় দখলদারি নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এই চুক্তি তৈরি হবার সময় মহাকাশে ছিল মূলত দুটি দেশের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা। কোনও ইলন মাস্ক বা বেজোস তাঁদের বিপুল অর্থ এবং ক্ষমতা নিয়ে এই জগতে অবস্থান করতেন না। আজকের দিনে অনেকেই বলছেন, এই চুক্তিটির পুনর্গঠন প্রয়োজন। কর্পোরেট সংস্থাগুলি অ্যাস্টরয়েডে মাইনিং শুরু করতে চাইছে। কম খরচে রকেট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ‘কেসলার সিনড্রোম’ এর বিপদ বাড়িয়ে তুলছে। লো-আর্থ অরবিট এখন নয়া ঠান্ডা লড়াইয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

এই সকল ‘বিপদ’-এর কথা ষাট বছর আগে কেউ ভাবেননি। কিন্তু এখনও না ভাবলে সমূহ বিপদ। স্পেস এক্সের মতো কর্পোরেট সংস্থার ‘কম খরচে উৎক্ষেপণ’-এর ‘অফার’-এর লোভে অনেক দেশই ‘উপগ্রহ অর্থনীতি’র মাধ্যমে বিপুল লাভের নেশায় পড়েছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি বিপুল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এই সংক্রান্ত বিপুল ঝুঁকিটা কি একেবারেই চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না? ‘কেসলার সিনড্রোম’-এর মতো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির অর্থনীতিও যে ভয়ানক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবার বদলে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণে খরচ বৃদ্ধি করাও হল, আবার তার রিটার্ন ঘরে ঢোকার আগেই সবকিছু মুখ থুবড়ে পড়ল (যার এখন সমূহ সম্ভাবনা)! শেষের সে দিন ভয়ংকর!!

(লেখক সমাজকর্মী আলিপুরদুয়ারের বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *