মরীচিকার মায়াজাল ও বিপন্ন কৈশোর

মরীচিকার মায়াজাল ও বিপন্ন কৈশোর

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


(ভার্চুয়াল জগতের নেশায় আচ্ছন্ন প্রজন্মের কাছে ভোরের স্নিগ্ধতা আজ ফিকে, সময় এসেছে যান্ত্রিকতা ঝেড়ে জীবনকে আলিঙ্গন করার)

সাহানুর হক

‘ঘুম কি ভাঙল তবে? ভোর হল? ক’টা বাজে এখন?’— আধো ঘুমে মায়ের এই চিরচেনা আকুতিগুলো আধুনিক প্রজন্মের কাছে যেন এক নিরর্থক শব্দতরঙ্গ। কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে যখন বেলা দুটোর সংখ্যাটি ভেসে ওঠে, তখন বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসে আজকের কলেজ পড়ুয়া। বিস্ময় আর বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করে, ‘মা, তুমি ডাকোনি কেন? এগারোটার গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারটা তো মিস হয়ে গেল!’

মায়ের অপরাধ নয়, বরং অপরাধ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর ভার্চুয়াল জগতের সেই মায়াবী উদ্যানের, যেখানে নিশিরাত বিভোর থাকলে সকালের হাজারো ডাক অরণ্যে রোদনে পরিণত হয়। শীতের ভোরের মিঠে রোদ, রাস্তার ধারের শিউলি ফুলের সুবাস কিংবা ভোরের আজানের সেই স্বর্গীয় মাধুর্য— এই ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা টিনএজারদের কাছে আজ অচেনা। মন্দিরে বাজতে থাকা ‘আমার চেতনা চৈতন্য করে’ গানের স্নিগ্ধতা তাদের কানে পৌঁছায় না, কারণ তাদের কানে তখন তারহীন ইয়ারফোনের যান্ত্রিক গর্জন।

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের বায়োতে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকে— ‘মাই লাইফ মাই রুলস’। প্রতি মুহূর্তের স্ট্যাটাসে পালটায় মেজাজ— কখনও ‘ফিলিং হ্যাপি’, কখনও ‘ফিলিং স্যাড’। এই লোকদেখানো মন খারাপ আর কৃত্রিম আনন্দের ভিড়ে তারা ভুলে গিয়েছে বাস্তব পৃথিবীর রং। ‘অরম্যাক্স ওটিটি রিপোর্ট ২০২৪’ বলছে, দেশের ৩৮.৪ শতাংশ সক্রিয় ওটিটি দর্শকই কিশোর-কিশোরী। শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্রই আজ একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। শৈশব-কৈশোরের এই গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া দেখে মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে।

হয়তো এভাবেই কেটে যাবে তাদের সোনালি দিনগুলো। তারপর একদিন হঠাৎ মাঝবয়সে পৌঁছালে কোনও এক ভোরে ফোনের স্ক্রিন না খুঁজে তারা হয়তো ছুটে যাবে প্রকৃতির সান্নিধ্যে। কিন্তু সেদিন আর সেই সতেজ ঘ্রাণ মিলবে না। হয়তো সময়ের নিয়মে ফুলেরাও সুবাস হারাবে, আর মন্দিরের সেই মরমি গানটিও হয়তো বন্ধ করে দেবেন পুরোহিত। তখন কি ওই ‘মাই লাইফ মাই রুলস’ কথাটি আঁকড়ে ধরে থাকা সম্ভব হবে?

এই অনিশ্চিত সময়ের স্রোত থেকে তরুণ প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনা আজ বড় প্রয়োজন। এত আলোচনা, এত লেখালেখি তবুও হুঁশ ফেরে না কারও। সতর্ক হওয়ার তাগিদ নেই, বরং অবাধ্য হওয়ার আনন্দই যেন মুখ্য। অথচ জীবন তো ক্ষুদ্র, তাকে এভাবে অবহেলায় নষ্ট করা কি সাজে? শিক্ষা তো সেই খোলা আকাশ যেখানে সভ্যতার ঘুড়ি ওড়ে। তবে কেন আমরা আবারও সেই ছোটবেলার কবিতা ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি’ মনে করতে পারি না? কেন ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’ মন্ত্রটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হতে পারে না?

যান্ত্রিকতার বিষবাষ্প আর অলীক অভ্যেসগুলোকে বিদায় জানিয়ে জেন জেড বা জেন আলফার কণ্ঠে আজ এই প্রত্যয় শোনা দরকার যে— ‘আমরাও পারি’। বড়রা বলেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা পাওয়া যায় তা ভাগ্য, কিন্তু সবকিছু থাকার পরেও যারা যান্ত্রিকতার শোক বহন করে তারা দুর্ভাগা। আসল ‘বাজিগর’ তো তারাই, যারা এই জটিল সফরের মাঝেও জীবনের প্রকৃত সুর খুঁজে পায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিও দেখে আমরা সাময়িক আনন্দ পাই ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে কি জীবনকে অনুভব করতে পারি? সময় এসেছে প্র্যাকটিক্যাল হওয়ার, মরীচিকার পেছনে না ছুটে আসল জীবনকে ছোঁয়ার।

(লেখক গ্রন্থাগারিক। দিনহাটার বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *